ববিতার বৈভব

ফরিদা আক্তার পপি (ববিতা) । অলঙ্করণ: সোহানুর রহমান
সত্যজিৎ রায় ও ইবনে মিজান— নির্মাণভঙ্গিতে আর চলচ্চিত্রদর্শনে দুই মেরুর দুই নির্মাতা হলেও তাদের দুজনেরই পছন্দের অভিনেত্রীর তালিকায় পাওয়া যায় ববিতার নাম। বঙ্গদেশের সমালোচক আর সিনেমার বক্স অফিস— এই দুটো বিপরীতমুখী স্রোতের সঙ্গম ঘটানো সহজ ব্যাপার নয়। ববিতা এই কাজ অনায়াসে করতে পেরেছেন বলেই চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তার নামে আলাদা অধ্যায়ের সৃষ্টি হয়েছে। তিনি যেমন জীবনঘনিষ্ঠ সিনেমায় স্বাচ্ছন্দ্যে অভিনয় করেছেন, তেমনই বিনোদনে ভরপুর সিনেমায় সুলভে বাজিমাত করেছেন। গ্ল্যামারের সঙ্গে গ্রামারের এমন বিরল মিশ্রণ ববিতার মধ্যে ঘটেছে বলেই তার নামের জয়রথ এখনো ছুটছে। জীবনের বাহাত্তর বসন্ত পেরিয়ে এখন তিনি কানায় কানায় পূর্ণ। একুশে পদক পাওয়ার পর এবারই তার প্রথম জন্মজয়ন্তী। আজ ৩০ জুলাই, এই বরেণ্য অভিনেত্রীর জন্মদিনে কথা বলব ‘সুপারস্টার’ ও ‘অ্যাক্ট্রেস’— এ দুই পরিচয়ে গড়ে ওঠা এক দুষ্প্রাপ্য শিল্পীর ক্যারিয়ারগ্রাফ নিয়ে।
ববিতার সিনেমার হাতেখড়ি ভগ্নিপতি জহির রায়হানের হাতে। এই নির্মাতা যেমন ‘কাঁচের দেয়াল’ ও ‘কখনো আসেনি’ নির্মাণ করে সমালোচকধন্য হয়েছেন, তেমনই ‘বেহুলা’ ও ‘সঙ্গম’ তৈরি করে দর্শকধন্য হয়েছেন। তার হাতে একাধিক সুপারস্টারের জন্ম হয়েছে, আবার বাজারকাটতি একঝাঁক নির্মাতার সৃষ্টি হয়েছে। এমন একজন বিচিত্র ও ব্যতিক্রমী শিল্পী যার ক্যারিয়ারের পথ এঁকে দিয়েছেন, তার জীবন যে লক্ষ্মী আর সরস্বতীর আশীর্বাদে সিক্ত হবে, তা অনুমান করা কি খুব শক্ত?
স্বাধীনতার আগে ‘শেষ পর্যন্ত, ‘টাকা আনা পাই’, ‘পীচ ঢালা পথ’ আর ‘স্বরলিপি’তে অভিনয় করেন ববিতা। কিন্তু তিনি উজ্জ্বল সূর্যের নিচে প্রকৃত তারকা হয়ে জ্বলে ওঠেন স্বাধীনতার পর। জহির রায়হান যে ববিতার স্বপ্নদ্রষ্টা, সেই ববিতার জন্ম হয় যুদ্ধশেষে। গা থেকে তারকার অলংকার ঝেড়ে ফেলার পরই খাঁটি সোনার মতো চকচক করে ওঠেন এই অভিনেত্রী। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাই সুপারহিট হয়। আর মোস্তফা মেহমুদ পরিচালিত রাজ্জাক-ববিতা জুটির এই চলচ্চিত্রের নাম ‘মানুষের মন’। বক্স অফিসে নিজের পতাকা ওড়ানোর পর ওই একই বছর অভিনেত্রী হিসেবে ববিতা নিজের জাত চেনান ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’তে। সদ্য সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধের কঠোর-কর্কশ বয়ানের এমন একটি সিনেমায় স্টারসুলভ চরিত্র ছুড়ে ফেলে বাংলাদেশের নারী হয়ে ওঠেন ববিতা। এর মাধ্যমে পারিবারিক ওস্তাদ সুভাষ দত্তের নির্দেশনায় কাজ করা শুরু। বড় বোন সুচন্দার ‘কাগজের নৌকা’ ভেসেছিল এই মাঝিরই হালে, ছোট বোন ববিতার অভিনেত্রী হওয়ার অভিযানের পালেও অনাগত দিনে হাওয়া দেবেন এই গুণী শিল্পী।
১৯৭৩ সাল ববিতার অভিনয়জীবনের সবচেয়ে ঘটনাবহুল বছর। বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ ঘটে ববিতার। ‘অশনি সংকেত’ তার বৃহস্পতিকে তুঙ্গে উঠিয়ে দেয়। সত্যজিতের মাস্টারক্লাসের ছাত্রী হিসেবে পাঠ নেওয়ার পর কেমন হবে একজন ঢালিউড স্টারের জীবন? তিনি কি আর চেনা পিচ ঢালা পথে ফিরে আসতে পারবেন? চেনা পিচে ছক্কা হাঁকাতে পারবেন আগের মতো? নাকি সিরিয়াস সিনেমার অভিনেত্রীর তকমায় আটকে যাবেন চিরদিনের মতো? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ববিতা দিয়ে দেন তিয়াত্তর সালেই। ওই বছর সত্যজিৎ রায়ের বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্রটির পাশাপাশি ববিতা অভিনয় করেন বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত আলমগীর কবিরের ‘ধীরে বহে মেঘনা’ এবং খান আতাউর রহমানের যুদ্ধোত্তর মাতৃভূমির হতবিহ্বল তারুণ্যের দলিল ‘আবার তোরা মানুষ হ’ চলচ্চিত্রে। আবার ওই একই বছর ববিতা অভিনয়ে করেন মোহসিন পরিচালিত ‘রাতের পর দিন’ চলচ্চিত্রে। সুপারহিট ব্যবসা করে নায়ক ওয়াসীমের প্রথম সিনেমাটি। এই সাফল্যের মধ্য দিয়ে ববিতা প্রমাণ করেন— যে রাধে সে চুলও বাঁধে।
এতদিন পর্যন্ত ববিতার যে সিনেমা ব্যবসা করত, সেটি সমালোচকের তালি পেত না; আর যে চলচ্চিত্র সমালোচকের প্রশংসা পেত, সেটি বক্স অফিসে হইচই ফেলত না। ১৯৭৪ সালে এসে একই সিনেমায় দুই সম্পূরক ঘটনার সংযোগ ঘটে। মিতা পরিচালিত ‘আলোর মিছিল’ সমালোচকদের যতটা সন্তুষ্ট করে, ততটাই প্রদর্শকদের পরিতৃপ্ত করে। পর্দায় ববিতার বিয়োগান্ত পরিণতির পরও সিনেমাটির ব্যবসা ঠেকে থাকেনি। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের এমন সাহসী চিত্রায়ণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য যেন এক মশাল।
১৯৭৫ সালে অভিনেত্রী হিসেবে ববিতার বিস্ফোরণ ঘটে। মোহসিন পরিচালিত ‘বাঁদী থেকে বেগম’, আজিজুর রহমান পরিচালিত ‘অপরাধ’, শিবলী সাদিক পরিচালিত ‘জীবন নিয়ে জুয়া’ সুপারহিট হয়। মিতা পরিচালিত ‘লাঠিয়াল’-এ সদম্ভ স্বাক্ষর রাখতে সমর্থ হন ববিতা। কিন্তু সব ছাপিয়ে যায় প্রথমবার তার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্তি। প্রবর্তনের বছরই শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে স্বীকৃতি পান ববিতা। তার এই অর্জন আসে একটা ব্যাপক ব্যবসাসফল সিনেমার মধ্য দিয়ে। অডিয়েন্স আর জুরি— এ দুই পক্ষকে সমানতালে তুষ্ট করেন তিনি। অবশ্য ‘বাঁদী থেকে বেগম’-এ ববিতার ক্যারেক্টার আর্ক যদি কেউ বিশ্লেষণ করেন, তাহলে কোনো রহস্য বিচলিত করবে না।
আজ ৩০ জুলাই অভিনেত্রী ববিতার ৭৪তম জন্মদিন
বিস্ময়ের ঘটনা ঘটে ১৯৭৬ সালে, যখন ববিতা আবারও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। আমজাদ হোসেনের ‘নয়নমনি’র জন্য তার এই অর্জন। বাংলার আবহমানকালের নিপীড়িত নারী মনি চরিত্রে তার অনবদ্য অভিনয় দেশ জুড়ে তাকে আগেই জননন্দিত করেছে, নতুন করে মেলে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। এখন ববিতা যেন আর্ট সিনেমা আর কমার্শিয়াল সিনেমার মিলনসেতু। তার সিনেমা বাজারের চাহিদা পূরণ করে, আবার শিল্পের দাবিও মেটায়। প্রযোজকদের তিনি চোখের মণি, আবার শিল্পরসিকদেরও তার ওপর সুনজর। এমন মণিকাঞ্চনযোগ কম নায়িকার ভাগ্যেই জোটে।
১৯৭৭ সালে ববিতা আরও একবার শিল্প আর বাণিজ্যের বেড়া ভেঙে দেন। সেই সঙ্গে করেন অনতিক্রম্য রেকর্ড। টানা তৃতীয়বারের মতো শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর জাতীয় পুরস্কার বগলদাবা করেন ববিতা। সুভাষ দত্তের ‘বসুন্ধরা’য় অসাধারণ অভিনয়ের স্বীকৃতি পান তিনি। একজন শিল্পী হয়ে শিল্পীজীবনের সাফল্য ও সংকটের আবহে তৈরি সিনেমায় সৃজনশীলতার ছাপ রেখে ববিতার এই অসামান্য অর্জন। ‘বসুন্ধরা’র মতো শিল্পশোভন চলচ্চিত্রে যিনি অভিনয় করেছেন, তিনি আবার ‘নিশান’-এর মতো ব্লকবাস্টার সিনেমায় পারফর্ম করেছেন। সাতাত্তরের সবচেয়ে ব্যবসাসফল মুভি ‘নিশান’ সুপারস্টার ববিতার মুকুটে যোগ করে আরও একটি পালক। আর জাতীয় পুরস্কার তাকে ঢালিউডের সিংহাসনে রাজরানীর আসনে বসায়।
পরের বছরও ববিতা তার শিল্পচেতনা আর তারকাদাপট ধরে রাখেন। একদিকে তিনি বাংলা ভাষার অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র ‘গোলাপী এখন ট্রেন’-এ মর্মস্পর্শী অভিনয় করছেন, আরেকদিকে ‘সোহাগ’ আর ‘মিন্টু আমার নাম’-এর মতো সুপারডুপার হিট সিনেমা দিয়ে বক্স অফিসে আগুন ধরাচ্ছেন। শিল্পসমালোচকরা ববিতার এই দ্বৈত রূপ দেখে অবাক। তিনি যেমন দুটো স্রোতকে একই মোহনায় মেশাচ্ছেন, তেমনই শিল্পসম্মত চলচ্চিত্র দিয়ে বাজার জয় করে নজিরবিহীন ঘটনা ঘটাচ্ছেন। গোলাপী চরিত্রে তার অভিনয়কে যেভাবে ঢালিউডের ইতিহাসে সেরার স্বীকৃতি দিতে হবে, সেভাবেই এই মুভির বাণিজ্যলক্ষ্মীর দেখা পাওয়াটাকে চিরকাল উদযাপন করতে হবে। কেননা, কেবল ববিতাই বলতে পারেন— ‘বাংলাদেশে কোনো কেলাস নাই গো!’
ববিতা ক্লাস আর মাসকে এককাতারে এনে দাঁড় করিয়েছেন বারবার। যে বছর তিনি এ জে মিন্টুর নায়িকা হয়ে ছবিঘরে উন্মাদনা সৃষ্টি করতে পারেন (প্রতিজ্ঞা), সেই একই বছর আমজাদ হোসেনের নায়িকা হয়ে (কসাই) সমালোচকদের সমীহ আদায় করে নিতে পারেন। যে বছর আমজাদ হোসেনের ‘সুন্দরী’তে ঝলসে ওঠেন, সেই বছর দেওয়ান নজরুলের ‘বারুদ’ সিনেমাতেও সৌন্দর্যের ঝলক দেখান।
‘লাইলী মজনু, ‘বদনাম’, ‘চ্যালেঞ্জ’— এক বছরে এত সুপারহিট চলচ্চিত্র বাংলাদেশকে উপহার দিয়েছেন ববিতা। চরিত্রের বৈচিত্র্যে, জনরার ভিন্নতায়, গ্ল্যামারের প্রদর্শনীতে সিনেমাগুলোর তুলনা নেই। এই সমস্ত বিনোদনমুখর মুভির ফাঁকেও তিনি ‘ফেরারী বসন্ত’র মতো অন্যরকম সিনেমায় কাজ করেছেন। যে বছর ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘তালাক’, ‘লাল মেমসাব’-এর মতো সুপারহিট চলচ্চিত্র নিজের ঝুলিতে পুরেছেন, সে বছরই ববিতা ‘পেনশন’-এর মতো জীবনধর্মী মুভিও করেছেন।
১৯৮৫ সালেও একই ঘটনা। ‘চোর’-এর মতো বছরের সর্বোচ্চ ব্যবসাসফল ছবিটা যেমন ববিতার দখলে, তেমনই বছরের সবচেয়ে ভালো সিনেমা ‘দহন’ও তার মুঠোয়। সোহেল রানার বিপরীতে তিনি যেমন সাবলীল, টিভির অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদির পয়লা চলচ্চিত্রেও তিনি তেমনই সহজ। ওই বছর ‘মিস লংকা’র মতো গ্ল্যামারসর্বস্ব মুভিতে কাজ করেছেন ববিতা, আবার বছরশেষে সাহিত্যনির্ভর ‘রামের সুমতি’ সিনেমার জন্য পেয়েছেন সেরা অভিনেত্রীর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।
পুরস্কার আর সফলতা— একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ হয়ে ধরা দিয়েছে ববিতার হাতে। শিল্পের সঙ্গে বাণিজ্যের বিরোধ মিটিয়েছেন তিনি। সংযোগ ঘটিয়েছেন মূলধারার সঙ্গে বিকল্পধারার। সত্যজিতের অনঙ্গ বউ হওয়ার পরও ইবনে মিজানের লাইলী হতে তার বুক কাঁপেনি। এমন দৃঢ়চেতা অভিনেত্রী বাংলাদেশে আর কেউ আছেন কি?
বিশেষ আয়োজন
অভিনেত্রী ববিতা এবারও একমাত্র ছেলে অনিকের সঙ্গে কানাডার টরন্টোতে জন্মদিন উদযাপন করবেন। এ উপলক্ষে গত ২৪ জুলাই টরন্টোতে পাড়ি দিয়েছেন তিনি। জন্মদিন উদযাপন শেষে আগামীকাল ভোরে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ হলিউডে আনন্দমেলা অ্যাওয়ার্ডে যোগ দিতে রওনা হবেন। আগামী ২ আগস্ট এই অনুষ্ঠানে তাকে প্রদান করা হবে আজীবন সম্মাননা। এদিকে ববিতার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার নিয়ে নির্মিত ‘বরেণ্য ববিতা’ অনুষ্ঠানটি আজ সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে চ্যানেল আইতে প্রচার হবে। এ ছাড়া মাছরাঙা টেলিভিশনের ‘ববিতাসমগ্র’ অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন দেশের ১২ জন তারকা। অনুষ্ঠানটি থাকছে আজ রাত ১০টা ৩০ মিনিটে।





