‘রোমান্টিক নন’ তবু শাবানার জন্য ফুলের দোকান কিনেছিলেন জাভেদ আখতার!

ক্যাপশন: শাবানা আজমী- জাভেদ আখতার। ছবি: ইনস্টাগ্রাম
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে একসঙ্গে পথচলা। তবু তাঁদের প্রেমের গল্প সিনেমার মতো রঙিন, নাটকীয় বা ‘প্রথম দেখাতেই প্রেম’ ধরনের নয়।এমনটাই জানিয়েছেন কিংবদন্তি গীতিকার জাভেদ আখতার ও বরেণ্য অভিনেত্রী শাবানা আজমি। সম্প্রতি এক খোলামেলা আলোচনায় নিজেদের ৪১ বছরের দাম্পত্য জীবন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তাঁরা ভেঙে দিলেন প্রেম ও বিবাহ নিয়ে প্রচলিত বহু ধারণা।
অনুষ্ঠানে জাভেদ আখতারকে প্রশ্ন করা হয়, তিনি ঠিক কবে শাবানার প্রেমে পড়েছিলেন? উত্তরে সোজাসাপ্টা বলেন, এমন কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্ত তিনি মনে করতে পারেন না। তাঁর মতে, সিনেমায় যেমন হঠাৎ এক নাটকীয় ‘আহা’ মুহূর্তে প্রেম জন্ম নেয়, বাস্তব জীবন তেমন নয়। ভালোবাসা ধীরে ধীরে তৈরি হয়, সময়ের সঙ্গে বদলায়, গভীর হয়। এটি এক চলমান প্রক্রিয়া, কোনো একক দৃশ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর এই ব্যাখ্যা যেন রূপালি পর্দার রোম্যান্টিক মিথ ভেঙে দেয়।
জাভেদের এই মন্তব্য শুনে শাবানা আজমি মজার ছলে বলেন, মানুষ যদি ভাবেন এত রোম্যান্টিক গান লেখেন বলে তিনি ঘরেও খুব রোম্যান্টিক স্বামী, তাহলে সেটি ভুল।
হাসতে হাসতেই তিনি বলেন, জাভেদের শরীরে নাকি রোম্যান্টিক একটি হাড়ও নেই।
তবে কথার ফাঁকেই উঠে আসে তাঁদের প্রেমের দিনের এক স্মরণীয় ঘটনা, যা শুনলে যে কেউ বলবেন, এও তো সিনেমার দৃশ্য হতে পারত।
প্রেমের শুরুর দিকে একদিন দুজন গাড়িতে যাচ্ছিলেন। রাস্তার পাশে একটি ফুলের দোকান দেখে শাবানা মুগ্ধ হয়ে বলেন, ফুলগুলো খুব সুন্দর। সেই মুহূর্তে কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই জাভেদ গাড়ি থামিয়ে পুরো ফুলের দোকানটাই কিনে ফেলেন।
স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে জাভেদ খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলেন, এমনটা একবারই হয়েছিল, এতে বাড়াবাড়ির কিছু নেই। কিন্তু শাবানার স্মৃতিতে সেটি আজও প্রেমের সময়ে দেওয়া সবচেয়ে স্বরণীয় উপহার হিসেবে গেঁথে রয়েছে। তাঁর ভাষায়, ওই ঘটনার পরই তিনি জাভেদের প্রেমে পুরোপুরি পড়ে যান। একঝটকায় পুরো ফুলের দোকান কিনে নেওয়া, এমন দৃশ্য সিনেমাতেও খুব একটা দেখা যায় না।
তবে তাঁদের সম্পর্কের পথ একেবারেই মসৃণ ছিল না। শাবানা স্মরণ করেন এমন এক সময়ের কথা, যখন দুজনের মধ্যে কথা বন্ধ ছিল। সেই সময় জাভেদ তাঁকে একটি কবিতা পাঠান। কবিতা পড়ে শাবানার মা সতর্ক করে দিয়েছিলেন, কবিদের কথায় সহজে ভেসে যেতে নেই। তিনি মেয়েকে বলেছিলেন, কবিরা শব্দের জাদু দিয়ে মানুষকে বশ করে ফেলে, সাবধানে থাকতে হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই শব্দের জাদুই তাঁদের দূরত্ব কমিয়ে আনে।
দাম্পত্য জীবনে মতভেদ ও ঝগড়া যে হয়নি, তা নয়। বরং দুজনেই স্বীকার করেন, তাঁরা দুজনই স্বাধীনচেতা, শক্ত ব্যক্তিত্বের এবং নিজস্ব মতামতে দৃঢ় মানুষ। ফলে তর্ক-বিতর্ক হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে বছরের পর বছর একসঙ্গে থাকতে থাকতে তাঁরা শিখে নিয়েছেন কীভাবে ঝগড়াকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। শাবানা জানান, যখনই তাঁরা অনুভব করেন যে তর্ক খুব খারাপ দিকে যাচ্ছে, তখন একটি নির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করেন, ‘ড্রপ ইট’। এই শব্দ উচ্চারণের পর তাঁরা বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দেন। পরে, কয়েক দিন পর যখন দুজনই শান্ত হন, তখন আবার সেই বিষয়ে আলোচনা করেন। এতে অপ্রয়োজনীয় কষ্ট, অসম্মান কিংবা পরে অনুশোচনা করার মতো কথা বলা থেকে নিজেদের বিরত রাখতে পারেন।
৪১ বছরের দাম্পত্য জীবনের অভিজ্ঞতায় জাভেদ আখতার ও শাবানা আজমি যেন দেখিয়ে দিলেন, প্রেম মানে কেবল আবেগের বিস্ফোরণ নয়, এটি সময়, বোঝাপড়া, ধৈর্য ও পারস্পরিক সম্মানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক যাত্রা। সিনেমার মতো ঝলমলে না হলেও, বাস্তবের এই ভালোবাসাই হয়তো আরও বেশি টেকসই ও গভীর।





