শিক্ষার মানোন্নয়নই বাংলাদেশে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ

অধ্যাপক ড. মোহাঃ হাছানাত আলী
একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন কোথায়? বড় বড় সেতু, প্রশস্ত মহাসড়ক, উঁচু ভবন, বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা আধুনিক নগরায়ণে? এসব অবশ্যই উন্নয়নের দৃশ্যমান প্রতীক। কিন্তু একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো তার মানুষ। আর সেই মানুষ তৈরির প্রধান কারখানা হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আজকের শ্রেণিকক্ষে বসে থাকা শিশুটিই আগামী দিনের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, উদ্যোক্তা, প্রশাসক, বিজ্ঞানী, কৃষিবিদ কিংবা রাষ্ট্রনায়ক। সে কারণে শিক্ষায় বিনিয়োগ আসলে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে বিনিয়োগ।
বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে শিক্ষার বিস্তারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। প্রাথমিক শিক্ষায় শিশুদের বিদ্যালয়ে নিয়ে আসা, বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ, উপবৃত্তি— মেয়েদের শিক্ষায় বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে সরকারি সহায়তা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে আগের তুলনায় অনেক বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক করেছে। কিন্তু শিক্ষার সুযোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে শিক্ষার মান। একজন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে ভর্তি হলো কি না, পরীক্ষায় পাস করল কি না কিংবা একটি সনদ অর্জন করল কি না— এসবের পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সে আসলে কতটুকু শিখল, কী ধরনের দক্ষতা অর্জন করল এবং ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য কতটা প্রস্তুত হলো।
এই জায়গাতেই বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় অংশ এখনো পরীক্ষাকেন্দ্রিক এবং মুখস্থনির্ভর। শিক্ষার্থীর মেধা, কৌতূহল, সৃজনশীলতা, যুক্তিবোধ, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা কিংবা বাস্তব জীবনে জ্ঞান প্রয়োগের দক্ষতার চেয়ে অনেক সময় পরীক্ষার নম্বরকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে ভালো ফলাফল করা অনেক শিক্ষার্থীও কর্মজীবনে গিয়ে যোগাযোগ, নেতৃত্ব, প্রযুক্তি ব্যবহার, দলগত কাজ, বিশ্লেষণী ক্ষমতা কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণে দুর্বলতা অনুভব করে। অথচ পরিবর্তিত বিশ্বে একটি সনদ শুধু প্রবেশের দরজা খুলতে পারে; সেখানে টিকে থাকতে প্রয়োজন দক্ষতা। বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, রোবোটিকস, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং জ্ঞানভিত্তিক কর্মসংস্থানের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। আগামী দিনের কর্মবাজারে এমন মানুষের প্রয়োজন হবে, যারা শুধু বইয়ের তথ্য মুখস্থ করতে পারে না, বরং তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, নতুন সমস্যা শনাক্ত করতে পারে, সমাধান উদ্ভাবন করতে পারে এবং প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে পরিবর্তন করতে পারে।
এ ক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। কারণ, প্রাথমিক শিক্ষা হলো পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি। একটি ভবনের ভিত্তি দুর্বল হলে তার ওপর যত সুন্দর তলা নির্মাণ করা হোক, ভবনটি কখনোই টেকসই হবে না। একইভাবে একজন শিশু প্রাথমিক পর্যায়ে সাবলীলভাবে পড়তে, লিখতে, মৌলিক গণিত করতে, নিজের কথা প্রকাশ করতে এবং যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে না শিখলে পরবর্তী পর্যায়ের শিক্ষা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। তাই প্রাথমিক শিক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রত্যেকটি শিশুকে শক্তিশালী ভাষাগত, গাণিতিক, সামাজিক ও চিন্তন দক্ষতার ভিত্তি দেওয়া।
লেখক : উপাচার্য, নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়।



