এখনই সময় ভাবনাকে প্রয়োগে রূপান্তরের

অধ্যাপক ড. এ বি এম শওকত আলী
শিক্ষা একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান ভিত্তি। কিন্তু শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়লেই একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সফল হয় না। প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন একজন গ্র্যাজুয়েট জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশ ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারেন। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা আমাদের এই জায়গাটিই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর লেবার ফোর্স সার্ভে-২০২৪ অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষিতদের বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ। জাতীয় বেকারত্বের হার যেখানে প্রায় ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ, সেখানে উচ্চশিক্ষিতদের বেকারত্ব প্রায় চার গুণ। প্রায় ৮ দশমিক ৮৫ লাখ গ্র্যাজুয়েট তখন বেকার ছিলেন। এটি শুধু কর্মসংস্থানের সংকট নয়। এটি আমাদের শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে বিদ্যমান অসামঞ্জস্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বিশ্বব্যাংকের একটি বিশ্লেষণ আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি চিত্র তুলে ধরে। প্রতি বছর গড়ে বাংলাদেশে ৬ লাখ ৫০ হাজারের বেশি উচ্চশিক্ষিত তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। কিন্তু ২০১৯ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, তাদের অর্ধেকের কম এক-দুই বছরের মধ্যে কর্মসংস্থান পান। ২০২৬ সালে এসে এই বাস্তবতা আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব ক্রমেই বাড়ছে, অথচ তাদের তুলনায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না পর্যাপ্ত হারে।
দেশের বৈচিত্র্যময় শিক্ষাব্যবস্থা: শক্তি ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর বৈচিত্র্য। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ, কারিগরি শিক্ষা এবং মাদ্রাসা শিক্ষার আলিয়া ও কওমি ধারা রয়েছে। এই বৈচিত্র্যময় শিক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজনীয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ধারাগুলোর মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় কতটা আছে?
একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বৈচিত্র্য থাকা ইতিবাচক। কিন্তু যদি প্রতিটি ধারা আলাদা পথে চলে এবং শিক্ষার্থী এক ধারা থেকে অন্য ধারায় সহজে যেতে না পারে, তাহলে এই বৈচিত্র্যই একসময় জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বর্তমানে ২ হাজার ২৫৭টি কলেজ ও প্রতিষ্ঠানে ৩৪ লাখ ২৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। এত বড় একটি ব্যবস্থাকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে আধুনিক, সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর কাঠামো অপরিহার্য। তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব শুধু বিপুল গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা নয়। গবেষণা, উদ্ভাবন ও জ্ঞানচর্চায় নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতাও সৃষ্টি করতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চশিক্ষাকে শুধু ডিগ্রি অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার ফলে শিক্ষা ও শিল্প খাতের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যদি গবেষণা ও উদ্ভাবনকে গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষার মান উন্নয়নে এগিয়ে আসে, তাহলে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও বাস্তবমুখী জ্ঞান আরও বাড়বে। এর মাধ্যমে শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী মানসম্মত ও শিল্প খাতের জন্য প্রয়োজনীয় গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা সম্ভব হবে।
আমাদের ভাবতে হবে, শিক্ষা খাতে যে বিপুল সরকারি সহায়তা ও ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে, তা দীর্ঘ মেয়াদে কীভাবে সর্বোচ্চ ফল দেবে। একই সঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষাকেও বৃহত্তর শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করা প্রয়োজন। দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত একজন শিক্ষার্থী বিজ্ঞান, মানবিকতা, প্রযুক্তি, নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের মৌলিক শিক্ষা পেতে পারে। এরপর যে শিক্ষার্থী যে শিক্ষায় বিশেষায়িত হতে চায়, সে সেই পথে যেতে পারে। নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শুধু প্রাথমিক শিক্ষা বা মাদ্রাসার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে রাখা প্রয়োজন।
একটি সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা: আমাদের একটি সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা দরকার। বিশ্বের অনেক দেশে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের আগে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলশিক্ষা সম্পন্ন করা একটি স্বাভাবিক ধাপ। তাই শুধু SSC পরবর্তী ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে না ভেবে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত একটি সমন্বিত শিক্ষাধারা সৃষ্টি করা যায় কি না, তা বিবেচনা করা জরুরি। এতে শিক্ষার্থীর পরিণত বয়সে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ এবং নিজের পছন্দের ক্ষেত্র নির্ধারণের সুযোগ বাড়বে। এখানে আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন প্রয়োজন। শিক্ষাকে শুধু চাকরির প্রস্তুতি হিসেবে দেখলে চলবে না। শিক্ষা হতে হবে কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং সমস্যা সমাধানের প্রস্তুতি।
বিইউবিটি ইনোভেশন হাব বাস্তবায়নে উদ্যোগ:
এখানে বিইউবিটি ইনোভেশন হাব একটি বাস্তব উদাহরণ হতে পারে। সম্প্রতি সরকারি উদ্যোগে আয়োজিত বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬-এ ৭০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণের মধ্যে গবেষণা, উদ্ভাবন, সৃজনশীলতা ও তরুণদের সম্পৃক্ততায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বিইউবিটি চ্যাম্পিয়ন নির্বাচিত হয়েছে। আমাদের এই হাব যদি জাতীয় পর্যায়ের এমন একটি উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পায়, তাহলে ফল প্রকাশ থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীর পছন্দ, আসনসংখ্যা, যোগ্যতা যাচাই এবং প্রতিষ্ঠান নির্বাচন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ার অটোমেশনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সমাধান তৈরিতে আমরা কাজ করতে প্রস্তুত।
লেখক : উপাচার্য, বিইউবিটি।



