রাবিতে ব্যাহত পাঠদান
কর্মকর্তার পদে শিক্ষকরা
- অধ্যাদেশে নেই প্রশাসক পদ ৯ দপ্তরে দায়িত্বে শিক্ষক
- দায়িত্ব না পেয়ে ক্ষুব্ধ প্রশাসনিক কর্তারা

ফাইল ছবি
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) অধ্যাদেশে ‘প্রশাসক’ নামে কোনো পদের অস্তিত্ব নেই। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯টি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে ‘প্রশাসক’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক। বিধি অনুযায়ী, এসব দপ্তরের দায়িত্ব কর্মকর্তাদের পালন করার কথা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে বসে রয়েছেন শিক্ষকরা। এতে প্রশাসনিক বৈধতা ও কর্মকর্তাদের পেশাগত অধিকার নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান, বঞ্চিত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, ছাপাখানা, বিজ্ঞান কারিগরি কারখানা, পরিবহন দপ্তর, কেন্দ্রীয় ক্যাফেটেরিয়া, রাকসুর কোষাধ্যক্ষ, লিগ্যাল সেল ও শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালার প্রধানকে অভিহিত করা হয় ‘প্রশাসক’ হিসেবে। তবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ১৯৭৩-এ এই নামে কোনো পদ নেই।
শুধু প্রশাসক পদেই নয়, অধ্যাদেশ অনুযায়ী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনের কথা থাকলেও রেজিস্ট্রার, কলেজ পরিদর্শক, আইসিটি সেন্টার, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তর, মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র, সেন্ট্রাল সায়েন্স ল্যাবরেটরি, শহীদ সুখরঞ্জন সমাদ্দার ছাত্র-শিক্ষক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং শহীদ মীর আব্দুল কাইয়ূম ইন্টারন্যাশনাল ডরমিটরির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদেও দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করছেন শিক্ষকরা।
কর্মকর্তাদের অভিযোগ, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয় না এসব পদে। এতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে তাদের পদোন্নতি ও পেশাগত অগ্রগতি। পাশাপাশি প্রশাসনিক কার্যক্রমেও পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব। বিভিন্ন সময় প্রশাসক পদ বাতিলসহ অধ্যাদেশ অনুযায়ী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি ও দাবি জানানো হলেও কর্ণপাত করেনি কর্তৃপক্ষ।
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, বিষয়টি সময়ের সঙ্গে একটি সাংগঠনিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল না থাকায় এসব দায়িত্ব পালন করছেন শিক্ষকরা। তবে বিষয়গুলোকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা করছে বর্তমান প্রশাসন।
অধিকার ফেরত চান কর্মকর্তারা: শিক্ষকতার পাশাপাশি এসব পদে শিক্ষকরা অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকায় তারা যথাযথ সময় দিতে পারেন না। অতীতে তাদের দায়িত্ব পালন নিয়ে বিভিন্ন সময় উঠেছে প্রশ্ন। বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের শিক্ষক ও সদ্য সাবেক রেজিস্ট্রার ইফতিখারুল আলম মাসউদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ক্লাস না নেওয়া ও খাতা না দেখার অভিযোগও উঠেছে বারবার। এ নিয়ে বিভাগে তালা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। অন্যান্য পদে থাকা শিক্ষকদের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময় অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কাজ যথাযথভাবে সমন্বয় না করার অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা। এসব কারণে পদগুলো কর্মকর্তাদের ফেরত দিয়ে শিক্ষকদের পাঠদানে নিয়োগ করার দাবি জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
‘দীর্ঘদিন কাজ করার পরও যদি কর্মকর্তারা তাদের প্রাপ্য দায়িত্ব ও মূল্যায়ন না পান, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই কর্মে অনীহা সৃষ্টি হয়। প্রশাসনিক এসব পদে সার্বক্ষণিক উপস্থিতি প্রয়োজন। কিন্তু অ্যাকাডেমিক ব্যস্ততার কারণে পূর্ণ সময় দিতে পারেন না শিক্ষকরা। এ কারণে অনেক ক্ষেত্রে কমে যায় কাজের গতি’— সমস্যা তুলে ধরলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অফিসার্স সমিতির সভাপতি আনোয়ারুল ইসলাম।
একই অভিযোগ করলেন অফিসার্স সমিতির কোষাধ্যক্ষ আল আমিন বিদ্যুৎ। তার ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশের ভলিউমে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে— রেজিস্ট্রার, পরিচালক ও লিগ্যাল সেলের মতো প্রায় ১০ থেকে ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ কর্মকর্তাদের দ্বারা পরিচালিত হওয়া উচিত। কিন্তু কর্তৃপক্ষ বারবার আশ্বস্ত করলেও ফিরিয়ে দিচ্ছে না পদগুলো।
‘নিয়মিত পাঠদান ও গবেষণার পরিবর্তে প্রশাসনিক দায়িত্বে ব্যস্ত শিক্ষকরা। এতে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমে। সময়মতো ক্লাস ও পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন না হওয়ায় বিলম্ব হয় ফল প্রকাশে। এর ধারাবাহিকতায় পরীক্ষা পিছিয়ে যায়, সেশনজট তৈরি হয় এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে’— অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী শরীফুল ইসলাম তানবীরের।
অন্যদিকে ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী সাকিবুল হাসান বললেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় মূলত জ্ঞানচর্চা, পাঠদান ও গবেষণার প্রতিষ্ঠান। একজন শিক্ষকের প্রধান দায়িত্ব শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক তত্ত্বাবধান এবং গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা। কিন্তু তাদের প্রশাসনিক পদে বসালে একদিকে অ্যাকাডেমিক ও গবেষণা কার্যক্রম ব্যাহত হয়, অন্যদিকে প্রশাসনিক কাজও প্রত্যাশিত মানের হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের এ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা উচিত।’
অধ্যাদেশের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন খান বললেন, ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, রেজিস্ট্রারসহ শিক্ষক ছাড়া বাকি সবাই মূলত কর্মকর্তা হিসেবে গণ্য। ফলে কর্মকর্তার পদগুলো শুধু একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির জন্য— এমন দাবি অধ্যাদেশের ভুল ব্যাখ্যা। উপাচার্য তার সুবিধামতো যোগ্য যে কাউকে, শিক্ষক বা কর্মকর্তা— এ ধরনের দায়িত্ব দিতে পারেন।
‘শিক্ষকদের অতিরিক্ত প্রশাসনিক চাপে তাদের মূল কাজ গবেষণা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। রেজিস্ট্রার বা পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের মতো পূর্ণকালীন পদে যোগ্য ও মেধাবীদের সরাসরি নিয়োগ দেওয়াই প্রশাসনিক গতিশীলতার জন্য সবচেয়ে শ্রেয়’— উল্লেখ করলেন অধ্যাপক ফরিদ।
দক্ষ জনবলের অভাবের কথা জানিয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদুল ইসলাম বললেন, ‘বিশেষায়িত এসব দপ্তর পরিচালনার মতো প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কর্মকর্তাদের মধ্যে পর্যাপ্তভাবে গড়ে না ওঠায় বিশ্ববিদ্যালয়কে এতদিন শিক্ষকদের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। প্রশাসন এখন এই ব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে আনতে কাজ করছে। তবে রাতারাতি সব পরিবর্তন করলে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে। তাই পরিকল্পিতভাবে ধীরে ধীরে করা হবে এই রূপান্তর।’





