১ বছরের কাজের ফিরিস্তি তুলে ধরলেন ডাকসু নেতারা

সংগৃহীত ছবি
দীর্ঘ ছয় বছর পর ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (ডাকসু) নির্বাচন। নির্বাচনের চার দিন পর এক বছরের জন্য দায়িত্ব নেন নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। মেয়াদ শেষে দায়িত্ব পালনের এক বছরের কার্যক্রম ও জবাবদিহির তথ্য তুলে ধরেছেন ডাকসুর নেতারা।
ডাকসুর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, এক বছরের মেয়াদ শেষ হলেও নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত সর্বোচ্চ আরও ৯০ দিন দায়িত্ব পালনের সুযোগ রয়েছে বর্তমান নেতাদের।
ডাকসু নেতাদের দাবি, দায়িত্ব নেওয়ার পর নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এক বছরে ৪১টি খাতে এক হাজারের বেশি কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সরকারের সহযোগিতার অভাবে বেশ কিছু উদ্যোগ এখনো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
বৃহস্পতিবার ডাকসু ভবনের সামনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এক বছরের কার্যক্রম তুলে ধরেন ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম ও জিএস এস এম ফরহাদ। এ সময় এজিএসসহ ডাকসুর অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
৫ নতুন হল ও ১০টি ভবন নির্মাণের কাজ চলমান
শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসনে নতুন হল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানালেন ডাকসুর নেতারা। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ হাজার ৮৪১ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের আওতায় পাঁচটি নতুন হল ও ১০টি ভবন নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় ডাকসু ভবনের বহুতল ভবন নির্মাণ, কেন্দ্রীয় মসজিদ ও কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি আধুনিকায়নের পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রকল্পের অর্থ দ্রুত ছাড় ও বাস্তবায়নে অর্থসচিব, অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ ও বৈঠক করার কথাও জানান তারা।
১৩ হলের রিডিংরুমে এসি স্থাপন
আবাসিক হলগুলোতে ছারপোকা ও মশক নিধন, পরিচ্ছন্নতা এবং সংস্কারকাজের জন্য বাজেট আদায় করা হয়েছে বলে দাবি করেন ডাকসুর নেতারা। ১৩টি হলের রিডিংরুমে এসি স্থাপন ও আধুনিকায়ন এবং বিভিন্ন কমনরুম সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তারা।
ক্যাম্পাসে ১৯ শাটল চালু
শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য ক্যাম্পাসে ১৯টি শাটল চালু করা হয়েছে বলে জানান ডাকসুর নেতারা। পরিবহনব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনতে চালকদের তালিকা, পোশাক ও ভাড়ার চার্ট তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য ক্যাম্পে ২০৫০০ শিক্ষার্থীকে সেবা
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের আধুনিকায়নে প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে দাবি করেন ভিপি সাদিক কায়েম। বিভিন্ন স্বাস্থ্য ক্যাম্পের মাধ্যমে ২০ হাজার ৫০০-এর বেশি শিক্ষার্থীকে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
মসজিদ সংস্কারে ৩ কোটি ব্যয়
এ ছাড়া কেন্দ্রীয় মসজিদ সংস্কারে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে দাবি করেন ডাকসুর নেতারা।
দক্ষতা উন্নয়ন ও আইনি সহায়তা
শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে এক হাজার ১০০-এর বেশি শিক্ষার্থীকে মোটরসাইকেল চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বলে জানান সাদিক কায়েম। উচ্চশিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন নিয়ে ১২০টির বেশি কর্মসূচি আয়োজনের কথাও জানান তিনি।
ডাকসুর দাবি, এক বছরে ৪০০-এর বেশি শিক্ষার্থীকে আইনি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে যৌন হয়রানি ও সাইবার বুলিংয়ের শিকার শতাধিক শিক্ষার্থীও রয়েছেন।
ছাত্রীদের নিরাপত্তায় যৌন হয়রানি ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের কাছে বিভিন্ন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে জানান ভিপি। এ ছাড়া মাতৃত্বকালীন ছুটি, ডে-কেয়ার, জিমনেসিয়াম ও ব্রেস্টফিডিং রুম স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা নিয়ে টানাপড়েন
শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগকে নিজেদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম হিসেবে তুলে ধরেন ডাকসুর নেতারা। তাদের দাবি, বিষয়টি এসএমটি ও একাডেমিক কাউন্সিলে অনুমোদনের পর সিন্ডিকেটে উত্থাপন করা হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখনো এটি বাস্তবায়ন করেনি।
পরে ডাকসুর নিজস্ব উদ্যোগে শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য একটি অনলাইন সাইট চালু করা হয়েছে জানান তারা।
গবেষণা ও উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজনের পাশাপাশি সংস্কৃতি ও প্রকাশনা খাতে সাহিত্য, সাময়িকী ও বই প্রকাশ এবং লাইব্রেরির সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথাও তুলে ধরেন ডাকসুর নেতারা।
পরিবেশ ও খাবারের মান উন্নয়ন
ক্যাম্পাসে ডাস্টবিন স্থাপন, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশ সংরক্ষণে বিভিন্ন কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে বলে জানান ডাকসুর নেতারা। ক্যাফেটেরিয়া ও ক্যান্টিনে খাবারের মান উন্নয়নেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
টিএসসিতে স্বল্পমূল্যে খাবারের ব্যবস্থা করা গেলেও স্বল্পমূল্যে টিসিবির পণ্য বিক্রিসহ কয়েকটি উদ্যোগ এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানান তারা।
এ ছাড়া সুফিয়া কামাল হলের ঝুঁকিপূর্ণ ফুটওভার ব্রিজ ও একটি যাত্রীছাউনি অপসারণ এবং আরেকটি যাত্রীছাউনি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান ডাকসুর নেতারা।
বাস্তবায়নের অপেক্ষায় যেসব উদ্যোগ
ডাকসুর নেতারা জানান, সব হলে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও প্রোগ্রামিং প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ, সার্টিফিকেশন সহায়তা, ইনোভেশন হাব ও জব ফেয়ার আয়োজনের মতো কয়েকটি উদ্যোগ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। মাঠ সংস্কার ও ডিজিটাল সার্ভের কাজও বন্ধ রয়েছে— দাবি ডাকসু নেতাদের।
রেজিস্টার্ড রিকশা চালু, পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োগ এবং পুরনো যানবাহন নিলামে দিয়ে দুটি মিনিবাস ও দুটি মাইক্রোবাস কেনার উদ্যোগ অনুমোদিত হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি অভিযোগ ডাকসুর।
ক্যাম্পাসের আটটি গেটে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ঢাকা মহানগর পুলিশের সঙ্গে সমন্বয়ের প্রস্তাব দেওয়া হলেও সরকার পরিবর্তনের পর প্রকল্পটি স্থগিত রয়েছে বলে দাবি করেন তারা।
এ ছাড়া এএফ রহমান হলের প্রবেশদ্বার, ডাকসু ক্যাফেটেরিয়া সংস্কার, পুকুরপাড় বাঁধাই, ওয়াকওয়ে, লাইটিং ও সৌন্দর্যবর্ধনসহ স্থানীয় সরকার বিভাগ ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন পাঁচটি প্রকল্পও বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানান তারা।
নিয়মিত ডাকসুর দাবি
ডাকসুর নেতারা দাবি করেন, এক বছরে বিভিন্ন অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যেও এক দিনের জন্য ক্লাস বা পরীক্ষা বন্ধ হয়নি। এ সময় ডাকসু ভবন সংস্কার, জাতীয় ও গুরুত্বপূর্ণ দিবস পালন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বার্ষিকী উপলক্ষে কর্মসূচি এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মতবিনিময়ের কথাও তুলে ধরেন তারা।
সিনেটে ডাকসুর প্রতিনিধিত্বের প্রসঙ্গ তুলে ধরে ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, বিভিন্ন স্থাপনা থেকে ঐতিহাসিকভাবে বিতর্কিত ব্যক্তিদের নাম অপসারণের দাবিতে ডাকসুর নেতারা সিনেট অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেছেন।
জবাবদিহির বিষয়ে তিনি বলেন, দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের কাছে গিয়ে নিজেদের কাজের হিসাব দেওয়া হয়েছে। ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি এর বাইরেও শিক্ষার্থীদের স্বার্থে বিভিন্ন কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
সর্বশেষ ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়া ডাকসু নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত 'ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেল বিজয়ী হয়। সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে সাদিক কায়েম, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে এস এম ফরহাদ এবং সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে মুহাম্মদ মহিউদ্দিন খান নির্বাচিত হন। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় সংসদের ২৮টি পদের মাঝে ২৩টিতেই জয়ী হন এই প্যানেলের প্রার্থীরা।



