জিন্নাহর ছবি নিয়ে বিতর্ক, কী বলছেন ডাকসুর সাবেক নেতারা

ছবির ওপরে ডাকসুর সাবেক ভিপি আ স ম আবদুর রব ও মাহমুদুর রহমান মান্না। নিচে সাবেক জিএস মুশতাক হোসেন। ছবি: সংগৃহীত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একক বা গৌরবোজ্জ্বল কোনো ছবি না থাকায় সমালোচনা করছেন ডাকসুর সাবেক নেতারা। এ ঘটনায় গতকাল সোমবার দিনভর উত্তেজনা বিরাজ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে।
তবে ডাকসুর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ বলেছেন, জিন্নাহকে গৌরবান্বিত করতে নয়; বরং বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে তার অবস্থানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরতেই এসব ছবি প্রদর্শন করা হয়েছে।
গত রবিবার সংস্কার শেষে সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয় ডাকসু সংগ্রহশালা। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাস থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান, পরবর্তী ডাকসু নির্বাচন এবং ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদী হত্যার পূর্বাপরসহ বিভিন্ন ঘটনার স্থিরচিত্র প্রদর্শন করা হয়েছে।
সংগ্রহশালায় জিন্নাহর তিনটি ছবি রয়েছে। এর মধ্যে একটি ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের একটি অনুষ্ঠানের ছবি। সেখানে জিন্নাহ ‘কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। আরেকটি ১৯৪০ সালের মার্চে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনের গ্রুপ ছবি। তৃতীয়টি ১৯৭০ সালের নির্বাচন নিয়ে জিন্নাহর ছবি-সংবলিত পাকিস্তানের ডন পত্রিকার একটি প্রতিবেদন ও পেপার কাটিং।
গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক ইতিহাসের সবকিছুই ডাকসু সংগ্রহশালায় থাকতে পারে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নেই, এমন বিষয় প্রদর্শনের দায়িত্ব ডাকসুর নয়।
আগামীর সময়কে তিনি বলেছেন, সংকীর্ণ ও ব্যক্তিগত অভিরুচি থেকে বেরিয়ে ইতিহাসের সত্যকে নির্মোহভাবে তুলে ধরতে হবে।
মহিউদ্দিন আহমদের ভাষ্য, ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে জিন্নাহ ভাষণ দিয়েছিলেন এবং উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। সেই বক্তব্যের প্রতিবাদ করেছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের আহ্বায়ক নঈমুদ্দীন আহমদ। ফলে জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের পাশাপাশি সেই প্রতিবাদের ইতিহাসও তুলে ধরা যেতে পারে।
এতদিন জিন্নাহর ছবি না রাখাকেও তিনি প্রতিহিংসার রাজনীতি হিসেবে দেখছেন। তার মতে, জিন্নাহর ছবি বাদ দেওয়া যেমন প্রতিহিংসার রাজনীতি হতে পারে, তেমনি শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি বাদ দেওয়াও একই ধরনের রাজনীতি।
কী বলছেন ডাকসুর সাবেক নেতারা
ডাকসুর সাবেক নেতাদের কেউ কেউ সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন এবং বঙ্গবন্ধুর ছবি না রাখার ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়েছেন।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না ১৯৭৯-৮০ ও ১৯৮০-৮১ শিক্ষাবর্ষে ডাকসুর ভিপি ছিলেন। তিনি এ ঘটনাকে অত্যন্ত দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন।
আগামীর সময়কে তিনি বলেছেন, ‘এত বড় একটি মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে দেশ স্বাধীন হয়েছে, সে দেশে পাকিস্তানের জাতির পিতার ছবি টানানোর পেছনে কী বিবেচনা থাকতে পারে, তা আমার বোধগম্য নয়।’
শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সরানোকে শোভন নয় উল্লেখ করে মান্না বলেছেন, ‘রাজনীতি করতে গিয়ে আমাদের নেতাদের প্রতি অশ্রদ্ধা জানানো বা তাদের বিতর্কিত জায়গায় নিয়ে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। এ ঘটনার পর মানুষের যে প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, তা খুব স্বাভাবিক। তবে বিষয়টির যত দ্রুত নিষ্পত্তি হয়, ততই মঙ্গল।’
স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলক ও ডাকসুর সাবেক ভিপি আ স ম আবদুর রব বলেছেন, ইতিহাস কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দ বা ব্যক্তিগত বিবেচনায় নির্ধারিত হতে পারে না। তার মতে, ডাকসু সংগ্রহশালা কোনো রাজনৈতিক দলের ইতিহাস প্রদর্শনীর স্থান নয়।
১৯৮৯-৯০ শিক্ষাবর্ষে ডাকসুর জিএস ছিলেন মুশতাক হোসেন। তিনি বলেছেন, বর্তমান ডাকসু নেতৃত্ব অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার ভাষ্য, ইতিহাসের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মতামত না নিয়ে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া দূরভিসন্ধিমূলক।
প্রতিবাদ
জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে গত সোমবার দিনভর ক্যাম্পাসে বিভিন্ন কর্মসূচি ও প্রতিবাদ হয়েছে।
ডাকসু সংগ্রহশালা থেকে জিন্নাহর ছবি অপসারণে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল।
অন্যদিকে সংগ্রহশালায় গিয়ে জিন্নাহ-সম্পর্কিত তিনটি ছবি ছিঁড়ে ফেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার।
এরপর একই স্থানে গোলাম আজমকে জুতাপেটার একটি ছবি টাঙিয়ে দেয় ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক অর্ক বড়ুয়ার নেতৃত্বে একদল শিক্ষার্থী। ছবিটি ১৯৮১ সালে বায়তুল মোকাররমে গোলাম আজমকে জুতাপেটার ঘটনার।
এদিকে ডাকসু সংগ্রহশালায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যথাযথভাবে সংরক্ষণের আহ্বান জানিয়েছে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর একাংশ। সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিম ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সংগীতা ইমাম এক বিবৃতিতে সংগ্রহশালায় প্রদর্শিত ঐতিহাসিক ছবি ও দলিলের সঠিক প্রেক্ষাপট এবং তথ্যসূত্র নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
তারা ভাষা আন্দোলন, গণআন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপনের আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ স্বাধীনতা সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ও ঘটনাবলির ঐতিহাসিক দলিল যথাযথ মর্যাদায় সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের দাবি জানিয়েছেন।
সংগ্রহশালার ভবিষ্যৎ সংস্কার ও কিউরেশনে ইতিহাসবিদ, মুক্তিযুদ্ধের গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের মতামত নেওয়ারও আহ্বান জানানো হয়েছে। তাদের মতে, সংগ্রহশালাকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠার জায়গা না বানিয়ে তথ্য, দলিল, গবেষণা ও বহুমাত্রিক ঐতিহাসিক স্মৃতির উন্মুক্ত শিক্ষাক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলা উচিত।
ডাকসু সংগ্রহশালা থেকে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি অপসারণ এবং শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি পুনঃস্থাপনের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে তিন বামপন্থী ছাত্রসংগঠন।
এদিন সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগ-বিসিএলের ব্যানারে এ বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এতে তিন সংগঠনের প্রায় ২৫ নেতাকর্মী অংশ নেন।
যা বলছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন
ডাকসুর কয়েকটি কর্মকাণ্ড নিয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ডাকসুর কিছু কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইন, বিধি, নীতিমালা ও প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিজ্ঞপ্তিতে ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহ এবং তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শনকে অগ্রহণযোগ্য বলা হয়েছে। ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এমন ব্যক্তিদের ছবি প্রদর্শনের ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে প্রশাসন।
এ ছাড়া ‘নির্ভীক জুলাই’ নামে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন এবং অনুমোদন ছাড়া শিক্ষক মূল্যায়ন ওয়েবসাইট চালুর বিষয়েও আপত্তি জানায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
প্রশাসন বলছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সিন্ডিকেটের ওপর ন্যস্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ধরনের ‘দ্বৈত প্রশাসন’-এর সুযোগ নেই। ডাকসুর কার্যক্রমও বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, বিধি ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হতে হবে।






