আইএমইডির প্রতিবেদন
ঋণের ফাঁদে তাঁতশিল্প
- মহাজন ও দোকানির কাছে জিম্মি তাঁতিরা
- এ শিল্পে জড়িত ১৫ লাখ মানুষ
- বছরে উৎপাদন ৬৮ কোটি মিটার বস্ত্র
- ৩৮ কোটি টাকার দুই অডিট আপত্তি
- আগাম পণ্য বিক্রি করে টাকা নেওয়ায় প্রকৃত মূল্য মিলছে না
- ১৫৮ কোটি টাকার প্রকল্পে অগ্রগতি ৯৭.১%
- ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না ৯৩.৬% তাঁতি
- মহাজনদের থেকে লাখ টাকা নিলে সপ্তাহে কিস্তি ৩-৫ হাজার টাকা

অসহায় জীবন পার করছেন এ শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ৯ লাখ মানুষ। ছবি: আগামীর সময়
ঋণের ফাঁদে আটকে গেছে দেশের তাঁতশিল্প। মহাজন ও দোকানিদের দৌরাত্ম্যে জিম্মি হয়ে পড়েছেন তাঁতিরা। এ ছাড়া সুতা ও রঙের দামের অস্থিরতা, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, যন্ত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারাসহ বিভিন্ন কারণে পুরো শিল্পই রয়েছে সংকটে। ফলে এক ধরনের অসহায় জীবন পার করছেন এ শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ৯ লাখ মানুষ। সেই সঙ্গে জীবিকা নিয়ে শঙ্কায় আছেন পরোক্ষভাবে কাজ করা আরও ৬ লাখ মানুষ। এত প্রতিবন্ধকতার পরও বছরে ৬৮ কোটি মিটার বস্ত্র উৎপাদন করে দেশের অর্থনীতিতে খাতটি রাখছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। এ পরিস্থিতিতে তাঁতিদের জীবনমান উন্নয়নে নেওয়া হয় ১৫৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প। এটির অগ্রগতি ভালো হলেও সফলতা নিয়ে তৈরি হয়েছে প্রশ্ন।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনের খসড়ায় উঠে এসেছে এসব তথ্য। ‘তাঁতিদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে চলতি মূলধন সরবরাহ ও তাঁতের আধুনিকায়ন’ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড।
আইএমইডির সাবেক সচিব আবুল মনসুর মো. ফয়েজউল্লাহ আগামীর সময়কে বলেছেন, দেশীয় ঐতিহ্যের অন্যতম হলো তাঁতশিল্প। এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত তাঁতিদের রক্ষা করা জরুরি। সেক্ষেত্রে চলমান প্রকল্পটির সম্প্রসারণ ও কার্যকর বাস্তবায়ন প্রয়োজন। এমন ব্যবস্থা করা দরকার, যাতে তাঁতিরা ঋণের জন্য মহাজন বা দোকানিদের কাছে না যান। তাদের মূলধনের জোগান নিশ্চিত করতে নানা পদক্ষেপ নিতে হবে।
খসড়ায় বলা হয়েছে, অনেক তাঁতি মহাজন ও দোকানিদের কাছ থেকে আগাম টাকা নিতে বাধ্য হন। পরে বাজারদরের কম দামে তাদের কাছে শাড়ি বা তৈরি পণ্য বিক্রি করতে হয়। এতে তাঁতিরা প্রকৃত লাভ পান না। আবার মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিলে এক লাখ টাকায় সপ্তাহে ৩-৫ হাজার টাকা সুদসহ কিস্তি দিতে হয়। মহাজন বা দাদনের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প অর্থায়ন চালু করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ তাঁত উন্নয়ন বোর্ড উৎপাদিত পণ্যকে জামানত রেখে তাঁতিদের ঋণ দেওয়ার পদ্ধতি চালু করতে পারে। তাঁতিরা প্রস্তাব করেছেন, বোর্ড তাঁতিদের তৈরি শাড়ি বা পণ্য জামানত হিসেবে জমা রেখে শাড়ি বা পণ্য উৎপাদন খরচের একটি অংশ ঋণ হিসেবে দিতে পারে। পরে পিক সিজনে জামানতের পণ্য বিক্রি করে ঋণের টাকা আদায় করা বা শোধ করা যাবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সামগ্রিকভাবে তাঁতিদের প্রায় ৭৯.৬ শতাংশ তাঁত সচল থাকলেও ৫.২ শতাংশ বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়া ১৫.২ শতাংশ তাঁত আংশিকভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ায় এই খাতটির স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এদিকে ১৮.১ শতাংশ তাঁতি সেমি-অটো ও ৩৫.১ শতাংশ পাওয়ারলুম প্রযুক্তির তাঁত ব্যবহারে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ালেও ঐতিহ্যবাহী হস্তচালিত তাঁতের ব্যবহার ক্রমেই সংকুচিত হয়ে ৫ শতাংশের নিচে এসেছে। এটি একটি সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক দ্বৈত সংকট তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ৮৫.৬ শতাংশ তাঁতির ক্ষেত্রে কাঁচামালের উচ্চমূল্য, বিশেষ করে সুতা ও রঙের অস্থির দাম, উৎপাদন ব্যয়কে ধারাবাহিকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে। ৯৩.৬ শতাংশ তাঁতিই পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। পণ্যের বাজারমূল্য সেই অনুপাতে বৃদ্ধি না পাওয়ায় ১০ শতাংশ তাঁতি প্রতি মাসে লাভের পরিবর্তে ক্ষতির মুখে পড়ছেন। ৩৭ শতাংশ তাঁতি কোনোরকমে তাদের জীবিকা নির্বাহ করছেন। পাশাপাশি আর্থিক কাঠামোয় তাঁত বোর্ডের দেওয়া ঋণের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পেলেও ঋণ অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা এবং অপর্যাপ্ত অর্থায়নের কারণে ৬৯.৮ শতাংশ তাঁতি একাধিক উৎস থেকে উচ্চ সুদের ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন। এ কারণে তাঁতিদের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি ঋণনির্ভর চক্র সৃষ্টি হচ্ছে।




