‘সরকার হাইপাওয়ার মানি ছাপানোয় মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে’
- মার্চে ছাপিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা

২০ হাজার কোটি টাকা শুধু মার্চে ছাপিয়েছে সরকার: পিআরআই
নতুন টাকা ছাপিয়েছে সরকার। মার্চ মাসেই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়। এক অনুষ্ঠানে এই তথ্য জানিয়েছেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) মুখ্য অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান।
‘এটা হাইপাওয়ার মানি, ছাপানো টাকা। অর্থাৎ এটার প্রভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে’— তিনি যোগ করেন।
রাজধানীর বনানীতে আজ বৃহস্পতিবার পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) ও অস্ট্রেলিয়ার সরকারের ‘ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ট্রেড’ (ডিএফএটি)-এর যৌথ উদ্যোগে হয় এই সেমিনার। এর শিরোনাম ছিল ‘ম্যাক্রোইকোনমিক ইনসাইটস : বাণিজ্য ও প্রবৃদ্ধির জন্য পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতি।’
পিআরআইয়ের কার্যালয়ে এই সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে প্রতিষ্ঠানটির মুখ্য অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান বলছিলেন, ‘আমরা সংস্কার থেকে পিছিয়ে গেলে সেটা আত্মঘাতী হবে। আশা করছি, সরকার ব্যাংক রেজল্যুশন পর্যালোচনা করবে। সংস্কার থেকে পিছিয়ে এসে সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিষয়ে টেনশন সৃষ্টি করেছে।’
তার পর্যবেক্ষণ, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৩০ শতাংশে পৌঁছানোয় দুর্বল হয়ে পড়েছে আর্থিক খাত। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি কমে নেমেছে ৬ শতাংশে। পাশাপাশি রাজস্ব খাতে পর্যাপ্ত সক্ষমতা না থাকায় সরকার উচ্চ সুদের স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে এবং সম্প্রতি নিতে হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থায়নও।
তিনি আরও যোগ করেছেন, এই ভঙ্গুর সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এখন তিনটি সমসাময়িক বহিরাগত চাপের মুখে— মধ্যপ্রাচ্য সংকট, আসন্ন এলডিসি উত্তরণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির অনিশ্চয়তা। এসব চাপ জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, বাণিজ্য প্রবাহের দুর্বলতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাতের ফলে প্রভাব ফেলছে অর্থনীতির সব স্তরে। একই সঙ্গে রপ্তানি কমে যাওয়া এবং জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে; আর সীমিত নীতিগত সক্ষমতা সামগ্রিক ঝুঁকি তুলছে আরও বাড়িয়ে। এই প্রেক্ষাপটে রাজস্ব ও আর্থিক খাতে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার থেকে সরে আসা পরিস্থিতিকে আরও করে তুলছে জটিল।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক তানজিমা মোস্তফা বলছিলেন, ‘রপ্তানি বৈচিত্র্যে জাহাজশিল্পের অপার সম্ভাবনা ও এর জন্য উন্নত অর্থায়ন ও নীতি সহায়তার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।’
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির বিআইজিডির ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো খন্দকার শাখাওয়াত আলী আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা বাড়ানো ও অতিরিক্ত মুদ্রা ছাপানোর মতো মূল্যস্ফীতিমূলক পদক্ষেপ এড়ানোর ওপর জোর দেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ও আন্তর্জাতিক চেম্বার অব কমার্সের (আইসিসি) সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলছিলেন, ‘বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণে রয়েছে, যেখানে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি, সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া এবং বিদ্যমান শক্ত ভিত্তিকে কাজে লাগানো অত্যন্ত জরুরি।’
সভাপতির বক্তব্যে পিআরআইয়ে চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার বলছিলেন, ‘বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা একটি মৌলিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হয়ে পড়েছে দুর্বল। যেসব দেশ এই ব্যবস্থার নেতৃত্ব দিয়েছিল, তারাই এখন করছে সেই নিয়ম লঙ্ঘন। ফলে এই ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়েছে। আমরা সম্ভবত একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছি, যা আরও বহুমুখী এবং সঠিকভাবে পরিচালিত হলে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারে।‘
তার মতে, ‘মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা কেবল আঞ্চলিক ক্ষেত্রে নয়, বরং বৈশ্বিক প্রভাব ফেলছে। এটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বিশ্ব বাণিজ্য ও উৎপাদনে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমেছে এবং বাণিজ্য প্রবৃদ্ধিও ২-৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আরও কমার ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশ এর প্রভাব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারবে না।’
জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। ‘বাংলাদেশের জ্বালানি মজুদ বর্তমানে প্রায় তিন মাসের চাহিদা মেটানোর মতো, যা একটি গুরুতর সীমাবদ্ধতা। জ্বালানির পাশাপাশি সার ও খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেলে তা সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করবে।
‘স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি প্রায় ৬ শতাংশ হতে পারে এবং গভীর সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে তা ৭-৮ শতাংশে উন্নীত হওয়া সম্ভব। তবে বর্তমান বাস্তবতায় ২০২৬ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি একটি যুক্তিসংগত প্রত্যাশা।’
আইএমএফ কর্মসূচি প্রসঙ্গে তিনি মনে করেন, ‘চূড়ান্ত কিস্তি প্রাপ্তি নির্ভর করছে বিনিময় হার সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, আর্থিক খাত সংস্কার এবং সামষ্টিক স্থিতিশীলতা অর্জনের ওপর। যদিও বৈদেশিক খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, তবে রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাতে এখনো কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে।’
তিনি আরও বলছিলেন, ‘২০২৬ অর্থবছরে রপ্তানি প্রায় ৫ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে আমদানি প্রায় ৫ শতাংশ বেড়েছে, যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আংশিক পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দেয়। তবে টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য ৭-৮ শতাংশ আমদানি প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, কারণ আমদানি উৎপাদন, বিনিয়োগ ও রপ্তানির জন্য অপরিহার্য উপকরণ সরবরাহ করে।’
আমদানি নীতির সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে তার কথা, ‘বাংলাদেশের আমদানি-জিডিপি অনুপাত প্রায় ১৬ শতাংশ, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেক কম। রপ্তানি সম্প্রসারণে আগ্রহী হলে উৎপাদন সংশ্লিষ্ট আমদানিতে উদারতা আনতে হবে।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অস্ট্রেলিয়ান দূতাবাসের ডেপুটি হেড অব মিশন ক্লিনটন পবকে বলছিলেন, ‘বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য টেকসই প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে কঠিন নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য।’
সমাপনী বক্তব্য টানেন পিআরআইয়ের গবেষণা পরিচালক ড. বজলুল হক খন্দকার— ‘২০৩৪-৩৫ সালের পর বাংলাদেশের জনসংখ্যাগত সুবিধা হ্রাস পেতে পারে, তাই এখনই উৎপাদনশীল সংস্কার বাস্তবায়ন জরুরি। একই সঙ্গে ব্যাংক ঋণের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে বন্ড বাজারকে শক্তিশালী করা জরুরি, যাতে রাজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং আর্থিক পরিসর সম্প্রসারিত হয়।’






