বিনিয়োগ আকর্ষণে কোম্পানি আইন সংশোধনের উদ্যোগ সরকারের

মতিঝিলে এফবিসিসিআই কার্যালয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভা। ছবি: আগামীর সময়
দেশে ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন, ডিজিটাইজেশন জোরদার এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর বড় ধরনের সংশোধনী আনতে যাচ্ছে সরকার। আজ সোমবার রাজধানীর মতিঝিলে এফবিসিসিআই কার্যালয়ে কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর খসড়া সংশোধনীর ওপর আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। এ ছাড়াও সভায় উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান।
আইনটির সার্বিক আধুনিকায়ন ও বৈশ্বিক মানদণ্ডে উন্নীত করার লক্ষ্যে মূলত পাঁচটি কৌশলগত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে সভায় জানানো হয়েছে। এগুলো হলো ব্যবসা পরিচালন প্রক্রিয়া সহজ করা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য দরজা-কপাট উন্মুক্ত করা, তথ্যপ্রযুক্তির সর্বাত্মক ব্যবহার নিশ্চিত করা, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার আইনি ভিত্তি দেওয়া এবং ব্যবসায়িক অঙ্গনে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা।
অনুষ্ঠানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য সংগঠন অনুবিভাগের মহাপরিচালক (যুগ্ম সচিব) মোহাম্মদ মোস্তফা জামাল হায়দার ‘কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ (তৃতীয় সংশোধন-২০২৬)’ শীর্ষক খসড়া প্রস্তাবটি বিশদভাবে উপস্থাপন করেন।
সেখানে জানানো হয়, আইনটিকে যুগের উপযোগী করতে মোট ৪০টি ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এর মধ্যে বেশকিছু নতুন সংজ্ঞা যুক্ত করা হচ্ছে। একাধিক উপ-ধারা সংশোধন করা হচ্ছে এবং বেশকিছু প্রশাসনিক বিধিতেও আনা হচ্ছে যুগোপযোগী পরিবর্তন।
প্রস্তাবিত সংশোধনের ফলে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন। এতদিন এক ব্যক্তি কোম্পানি বা ওপিসি গঠনের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন পরিশোধিত মূলধনের বাধ্যবাধকতা ২৫ লাখ টাকা থাকায় সাধারণ উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হতেন।
সভায় উত্থাপন করা প্রস্তাব অনুযায়ী, এই মূলধনের সীমা ৮০ শতাংশ কমিয়ে মাত্র পাঁচ লাখ টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট পরিমাণ টার্নওভারের যে বাধ্যবাধকতা ছিল, তাও পুরোপুরি তুলে নেওয়া হয়েছে। যাতে স্বত্বাধিকারী ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসাকে সহজেই নিবন্ধিত কোম্পানির আওতায় নিয়ে আসতে পারেন।
প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা কাটাতেও নেওয়া হচ্ছে বড় পদক্ষেপ। এখন থেকে কোম্পানির সংঘস্মারক বা অবজেক্ট ক্লজ পরিবর্তনের জন্য হাইকোর্টে না গিয়ে সরাসরি জয়েন্ট স্টক কোম্পানির রেজিস্ট্রারের অনুমোদনের মাধ্যমেই তা সম্পাদন করা যাবে।
এতে উদ্যোক্তাদের দীর্ঘমেয়াদি বিচারিক প্রক্রিয়া, সময় ও আইনি খরচ অনেকাংশে বেঁচে যাবে। এ ছাড়া যেকোনো তথ্য বা প্রতিবেদন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে অস্পষ্ট মেয়াদের পরিবর্তে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হচ্ছে।
আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে এখন থেকে কোম্পানির যাবতীয় রেজিস্টার বই কাগজের পাশাপাশি বা পুরোপুরি ইলেকট্রনিক মাধ্যমে সংরক্ষণের আইনি স্বীকৃতি মিলবে। প্রতিটি কোম্পানির পরিচালক ও মালিকদের এনআইডি, পাসপোর্ট, টিন, মোবাইল নম্বর এবং ই-মেইলের তথ্য সরকারের সুরক্ষিত অনলাইন ডেটাবেজে সংরক্ষিত থাকবে।
প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে কোম্পানি আইনের অধীনে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআরকে আইনি বাধ্যবাধকতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। বিশ্বের অন্যান্য উন্নত ও অগ্রসরমান অর্থনীতির আদলে এ নিয়ম যুক্ত করায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের পাশাপাশি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও গতি আসবে।
ব্যবসায় স্বচ্ছতা আনয়ন এবং ভুয়া বা শেল কোম্পানি বানিয়ে অর্থ পাচার ও কর ফাঁকি রোধে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকৃত মালিক বা ‘হিতগ্রাহী স্বত্ব’-এর স্পষ্ট সংজ্ঞা যুক্ত করা হয়েছে।
পাশাপাশি মানি লন্ডারিং ও দুর্নীতির তদন্তে প্রয়োজনে বিদেশি নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে তথ্য বিনিময়ের পথ উন্মুক্ত করা হয়েছে। কোম্পানি বিলুপ্ত হলেও এর কাগজপত্র ও রেকর্ড পূর্বে তিন বছর রাখার নিয়ম থাকলেও তা বাড়িয়ে পাঁচ বছর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিটি কোম্পানির নাম ও ধরন সুনির্দিষ্ট করতে নামের শেষে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির জন্য পিএলসি, প্রাইভেট কোম্পানির জন্য লিমিটেড এবং এক ব্যক্তি কোম্পানির ক্ষেত্রে ওপিসি যোগ করা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
বড় ও শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোয় যোগ্যতাসম্পন্ন কোম্পানি সচিব নিয়োগ আবশ্যক করা হয়েছে। আর চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, আইনজীবী বা আয়কর উপদেষ্টাদের আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কোম্পানি প্রতিনিধি’ হিসেবে আইনি মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে।
সভায় উপস্থিত অতিথিরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন, প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়িত হলে বৈশ্বিক ব্যবসায়িক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে। রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে এবং দেশীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এক নতুন গতির সঞ্চার হবে।





