বিশ্বব্যাংকের কাছে ১০ বিলিয়ন ডলার চায় বাংলাদেশ

সংগৃহীত ছবি
আর্থিক খাতের চাপ সামলাতে আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের সহায়তা চাইছে বাংলাদেশ। জ্বালানি খাতে বাড়তি ভর্তুকির ব্যয় মেটানো এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে মোট ১৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিতে চায় সরকার। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের কাছে চাওয়া হচ্ছে ১০ বিলিয়ন ডলার। আর আইএমএফের কাছ থেকে প্রত্যাশা ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। ব্যাংককে শুরু হওয়া বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভার প্রথম দিনেই বাংলাদেশের ঋণের এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের নিয়মিত সহায়তার বাইরে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার পেতে চায় বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে সংস্থাটির সঙ্গে তিন বছরের জন্য 'কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক' চূড়ান্ত করবে সরকার। এর মাধ্যমে আগামী তিন বছরে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতার ক্ষেত্র ও পরিকল্পনা নির্ধারণ করা হবে।
অন্যদিকে, আইএমএফের কাছ থেকে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা পাওয়ার প্রত্যাশা করছে সরকার। তবে এ ঋণের সঙ্গে যুক্ত সংস্কার শর্তগুলো একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে চায় না বাংলাদেশ; বরং আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে এসব সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। সোমবার ব্যাংককের কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভার প্রথম দিনের কর্মসূচি শুরু হয়। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা এবং আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা নিজ নিজ সেশনের মাধ্যমে কর্মসূচির সূচনা করেন। সকাল ৯টা থেকেই সম্মেলনকেন্দ্রে বিদেশি অতিথি, সাংবাদিক ও বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয়। প্রবেশপথে বাংলাদেশসহ ১৯৩টি দেশের জাতীয় পতাকা উড়তে দেখা যায়। শহরের বিভিন্ন প্রান্তের ১০টি নির্ধারিত স্থান থেকে থাইল্যান্ড সরকার নিজস্ব পরিবহনে অতিথিদের সম্মেলনকেন্দ্রে পৌঁছে দেয়।
উদ্বোধনী দিনের কর্মসূচিতে বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশের মধ্যে বৈঠক ছাড়াও ছিল সিভিল সোসাইটি টাউনহল অধিবেশন। এই অধিবেশনে বিশ্বব্যাংক প্রধান অজয় বাঙ্গা নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার সূচনা করেন। এ ছাড়া ফিলানথ্রপি ফোরামের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করেন বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান জ্ঞান কর্মকর্তা প্যাসকেল ডোনেট এবং অন্যান্য বৈশ্বিক অংশীদার।
১০ বিলিয়ন ডলারের বাড়তি ঋণ চায় বাংলাদেশ
সম্মেলনের প্রথম দিনে বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশের মধ্যে দেড় ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক হয়। এতে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বললেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে। ফলে সরকারকে বাড়তি ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। অর্থনৈতিক ঘাটতি মেটাতে এ খাতে সহায়তা দিতে বিশ্বব্যাংক এগিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অর্থমন্ত্রী বললেন, বর্তমান অর্থনীতির ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে দুই থেকে তিন বছরের একটি সুরক্ষাবলয় তৈরিতে বিশ্বব্যাংক সহযোগিতা করবে। এজন্য সংস্থাটির সঙ্গে একটি কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। এর মাধ্যমে আগামী দিনের সহযোগিতার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নির্ধারিত হবে।
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সঙ্গে সংস্কার শর্ত এবং ঋণ কর্মসূচি নিয়ে সরকার আশাবাদী বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তার ভাষ্য, সংস্থা দুটির শর্তের সঙ্গে বাংলাদেশের পরিকল্পনার বড় ধরনের কোনো দ্বিমত নেই। সংস্কার কর্মসূচি ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। এ নিয়ে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব।
অর্থমন্ত্রী আরও বললেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে তেল ও গ্যাসের উচ্চমূল্যের কারণে জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয় তৈরি হয়েছে। এই চাপ মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংকের নিয়মিত সহায়তার বাইরে আরও ঋণ পাওয়া যাবে। তবে বৈঠকে উপস্থিত একটি সূত্র জানিয়েছে, এজন্য ১০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ প্রস্তাব নিয়ে এগোচ্ছে সরকার।
আইএমএফের সংস্কার শর্ত বাস্তবায়ন কঠিন হবে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বললেন, কিছু নির্দিষ্ট শর্ত নিয়ে বর্তমানে আলোচনা চলছে। পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সেগুলো পরিমার্জন করা সম্ভব। একসঙ্গে অনেকগুলো সংস্কার চাপিয়ে না দিয়ে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আগামী পাঁচ থেকে আট বছর ব্যাংক খাতের জন্য প্রতি বছর ১৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে— এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী জানালেন, সরকার এরই মধ্যে এজন্য প্রয়োজনীয় তহবিল বরাদ্দ করে রেখেছে। তবে শুধু সরকারি তহবিল দিয়ে এ চাহিদা পূরণ করা যথেষ্ট নয়। এ কারণে আন্তর্জাতিক অর্থ করপোরেশন (আইএফসি) ব্যাংকের মূলধন পুনর্গঠনে সহায়তার আগ্রহ দেখিয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি ইকুইটি খাত থেকেও ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।
ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, আমানতকারীদের মধ্যে যে ভীতি কাজ করছিল, তা এখন পুরোপুরি কেটে গেছে। বরং ব্যাংকে আমানত ফিরছে এবং নিট আমানত বাড়ছে। পুঁজিবাজারেও ইতিবাচক ধারা ফিরছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও আবার বিনিয়োগে এগিয়ে আসছেন।
বিশ্বব্যাংকের 'ফিলানথ্রপি হাব' উদ্বোধন
উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে দানশীল ব্যক্তি ও দাতব্য সংস্থাগুলোর মূলধন, জ্ঞান এবং বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক কাজে লাগাতে 'ফিলানথ্রপি হাব' নামে নতুন একটি প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ। সম্মেলনের উদ্বোধনী দিনে ফিলানথ্রপি ফোরামে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে উদ্ভাবনী ধারণা ও পরীক্ষামূলক প্রকল্পগুলো বৃহত্তর পরিসরে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে বিশ্বব্যাংক। পাশাপাশি টেকসই স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নে এশিয়ার শীর্ষস্থানীয় জনহিতকর নেটওয়ার্ক এভিপিএন এবং টেমাসেক ট্রাস্টের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
সরকারি সম্পদের সীমাবদ্ধতার এ সময়ে যৌথ অংশীদারত্বের মাধ্যমে বিশ্ব জুড়ে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করাই এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।



