এক কোডেই সব লেনদেন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ডিজিটাল লেনদেন আরও সহজ ও প্রসারিত করতে দেশে বাধ্যতামূলকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে ‘বাংলা কিউআর’ (কুইক রেসপন্স) কোড। এখন শুধু একটি কিউআর কোড স্ক্যান করেই যেকোনো ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবার (এমএফএস) মাধ্যমে লেনদেন করা সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, এই প্রযুক্তির কল্যাণে বর্তমানে দেশে দৈনিক গড়ে প্রায় ৫০ হাজার লেনদেন সম্পন্ন হচ্ছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১৫ কোটি টাকা।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে খুচরা বিক্রেতাদের সহজে এই সেবায় যুক্ত করা জরুরি। কিন্তু রিটেইল হিসাব খোলার প্রক্রিয়াটি এখনো পুরোপুরি ডিজিটাল না হওয়ায় এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্রের অভাবে অনেকেই হিসাব খুলতে পারছেন না। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের মধ্যে এই প্রযুক্তি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণার ঘাটতি রয়েছে। অনেক দোকানে কিউআর স্ট্যান্ড থাকলেও ব্যবহারে ভীতি, দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ, স্মার্টফোনের সীমিত ব্যবহার, বিদ্যুৎ-বিভ্রাট এবং বিভিন্ন অ্যাপের ব্যবহার পদ্ধতিতে ভিন্নতা গ্রাহক ও বিক্রেতাদের বিভ্রান্ত করছে। এ ছাড়া নগদ লেনদেনের প্রতি মানুষের চিরায়ত নির্ভরতা এবং ডিজিটাল লেনদেনে কর বা হিসাবসংক্রান্ত ভীতিও একটি বড় বাধা।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাটি হলো লেনদেনের মাশুল। বাংলা কিউআরের মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেনের জন্য ছোট-বড় সব বিক্রেতাকে বাধ্যতামূলক ১ শতাংশ মাশুল গুনতে হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানালেন, দেশের মানুষ মূলত নগদ লেনদেনে অভ্যস্ত। ক্যাশলেস সমাজ গড়তে হলে ক্যাশব্যাকের মতো প্রণোদনা দিয়ে মানুষকে উৎসাহিত করতে হবে। উল্টো ১ শতাংশ চার্জ আরোপের ফলে একজন দোকানি ১ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি করে কিউআরে পেমেন্ট নিলে পাচ্ছেন ৯৯০ টাকা। সুপারশপগুলো হয়তো এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবে, কিন্তু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পক্ষে তা অসম্ভব।
দুর্নীতি দূর করতে চাইলে ডিজিটাল লেনদেন বৃদ্ধির বিকল্প নেই
—মোস্তফা কে মুজেরী
ব্যাংকগুলোর তথ্য বলছে, একজন খুচরা বিক্রেতাকে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেন গ্রহণে প্রস্তুত করতে কমপক্ষে ৫০০ টাকা খরচ হয়। কিন্তু এই খরচের বিপরীতে প্রণোদনা না থাকায় কিউআর কোড স্থাপনে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোরও আগ্রহ কম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী বলেছেন, দুর্নীতি দূর করতে চাইলে ডিজিটাল লেনদেন বৃদ্ধির বিকল্প নেই। এ ধরনের লেনদেনে গ্রাহক ও প্রাপক— উভয়েই স্বস্তি পাবেন। সরকারেরও রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পাবে। বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়াতে অন্য দেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে হবে। এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না, যাতে সেবাটি বাধাগ্রস্ত হয়।
কিউআর কোডের ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, ১৯৯৪ সালে জাপানি কোম্পানি ডেনসো ওয়েভের হাত ধরে এর আত্মপ্রকাশ ঘটে। তবে বাংলাদেশে এর যাত্রা শুরু হয় ২০২৩ সালের ১৮ জানুয়ারি, রাজধানীর মতিঝিলে একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্পের মাধ্যমে। পরে ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর থেকে সব ব্যাংক, পিএসপি (পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার), পিএসও এবং এমএফএস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তাৎক্ষণিক আন্তঃলেনদেন শুরু হয়।
ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচের মাধ্যমে বাংলা কিউআর লেনদেন নিষ্পত্তি হয়, তাই ঝুঁকি নেই
—বাংলাদেশ ব্যাংক
গত জুলাই থেকে সব কিউআর বাতিল করে বাংলা কিউআর বাধ্যতামূলক করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর সব ব্যাংক ও এমএফএস তাদের অ্যাপ হালনাগাদ করে বাংলা কিউআর ব্যবহারের উপযোগী করে। তবে সব গ্রাহক অ্যাপটি হালনাগাদ করেনি। এ ছাড়া এমএফএসগুলোকে তাদের নিজস্ব অ্যাপ পরিবর্তন করে বাংলা কিউআর করতে হয়েছে। এতে তাদের করতে হয়েছে বড় বিনিয়োগ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলা কিউআর প্ল্যাটফর্মে সোনালী, জনতা, অগ্রণী, ব্র্যাক, ডাচ্-বাংলা, সিটি, ইসলামী ব্যাংকসহ ৪২টি বাণিজ্যিক ব্যাংক যুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি বিকাশ, রকেট, নগদ, উপায়, এমক্যাশের মতো সাতটি এমএফএস এবং শিওরক্যাশ, ট্যালিপে ও পাঠাও পে-এর মতো তিনটি পিএসপি এই সেবা দিচ্ছে। সারা দেশে প্রায় ১৭ লাখ সক্রিয় মার্চেন্ট পয়েন্টে বসানো হয়েছে এই বারকোড।
এর মধ্যে শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠান দিয়েছে ১৫ লাখ ৬৩ হাজার। এককভাবে সর্বোচ্চ ৫ লাখ মার্চেন্ট পয়েন্টে কিউআর রয়েছে এমএফএস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশের। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২ লাখ ১০ হাজার মার্চেন্ট পয়েন্টে কিউআর দিয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক এবং তৃতীয় সর্বোচ্চ পূবালী ব্যাংক দিয়েছে ২ লাখ ৬ হাজার। এ ছাড়া ট্যালিপের প্রায় ২ লাখ, সেবা ফিনটেকের ১ লাখ ১৯ হাজার, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ১ লাখ ৯ হাজার, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ৮৫ হাজার, সোনালী ব্যাংকের ৫৪ হাজার, পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটর ডিজি ই-পে সার্ভিসের ৪৫ হাজার এবং সিটি ব্যাংকের ৩৭ হাজার মার্চেন্ট রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচের মাধ্যমে বাংলা কিউআর লেনদেন নিষ্পত্তি হয়। তাই এতে ঝুঁকির কিছু নেই, তবে ব্যাংকের অ্যাপ হালনাগাদ না করা, কিউআর কোড বা হিসাবে ত্রুটি ও নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে লেনদেনে সমস্যা হয়। ধীরে ধীরে সমাধান হয়ে যাবে এই সমস্যার।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হুসাইন বলেছেন, লেনদেনের একটি বড় অংশ বাংলা কিউআর। এই নতুন ব্যবস্থায় রূপান্তর দ্রুত হচ্ছে। ডিজিটাল লেনদেনের প্রতি মানুষের আস্থা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা সম্ভব হলে আগামীতে বাংলা কিউআর দেশের নগদহীন অর্থনীতির অন্যতম প্রধান মাধ্যম হবে।
বর্তমানে বাংলা কিউআর সেবার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে দেশের বিভিন্ন ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) এবং পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (পিএসপি)। এই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে— সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বিডিবিএল, কৃষি, রাকাব, বেসিক, ইসলামী, ব্র্যাক, ডাচ্-বাংলা, ইস্টার্ন, সিটি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, প্রাইম, প্রিমিয়ার, এশিয়া, এনসিসি, মার্কেন্টাইল, ওয়ান, ট্রাস্ট, ঢাকা, সাউথইস্ট, যমুনা, মিডল্যান্ড, ইউসিবি, এবি, স্ট্যান্ডার্ড, মেঘনা, গ্লোবাল, সোশ্যাল, ফার্স্ট সিকিউরিটি, শাহজালাল, এক্সিম, ইউনিয়ন, কমিউনিটি, পদ্মা, বেঙ্গল, সিটিজেন্স, এনআরবি ও কমার্শিয়াল ব্যাংক।
অন্যদিকে, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মধ্যে গ্রাহকরা বিকাশ, রকেট, নগদ, উপায়, এমক্যাশ, ওকে ওয়ালেট এবং ট্যাপের মাধ্যমে এই সুবিধা পাচ্ছেন। পাশাপাশি পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার বা পিএসপি হিসেবে শিওরক্যাশ, ট্যালিপে এবং পাঠাও পে বাংলা কিউআরের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে ডিজিটাল লেনদেনের এই নিরবচ্ছিন্ন সেবায় যুক্ত রয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, ‘বাংলা কিউআরের মাধ্যমে আমরা গ্রাহকদের লেনদেনকে সহজ করে দিয়েছি। ডিজিটাল অর্থনীতির স্বার্থে আরও গ্রাহকবান্ধব উদ্যোগ নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর সহজ সেবার জন্য এটি দিন দিন প্রসারিত হচ্ছে।




