১০ লাখ কোটির রাজস্ব শর্ত আইএমএফের
- সংস্থাটির সঙ্গে ঋণচুক্তির প্রধান শর্ত কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো
- এ লক্ষ্য সামনে রেখে এনবিআর কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে নতুন ঋণ নিতে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর কর্মপরিকল্পনা তৈরি করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমান ৬ দশমিক ৭ থেকে বাড়িয়ে ১০ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করতে চায় সংস্থাটি। এ লক্ষ্য অর্জনে ২০৩০ সালে প্রায় ৯ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে হবে।
নতুন ঋণচুক্তি চূড়ান্ত করতে আগামী ৩ ও ৪ নভেম্বর ঢাকায় আসার কথা আইএমএফ প্রতিনিধিদলের। সংস্থাটির অন্যতম শর্ত হলো রাজস্ব আদায় বাড়ানো। এজন্য কোন খাত থেকে অতিরিক্ত রাজস্ব আসবে, কীভাবে নতুন করদাতা শনাক্ত ও করজাল সম্প্রসারণ করা হবে এবং রাজস্ব প্রশাসনের অটোমেশন কীভাবে এগোবে, তার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা চেয়েছে আইএমএফ।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালে বাংলাদেশের বর্তমান বাজারমূল্যে জিডিপির আকার দাঁড়াতে পারে প্রায় ৯৪ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকা। এর ১০ দশমিক ৫ শতাংশ হিসাবে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ হতে হবে প্রায় ৯ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ গত অর্থবছরের তুলনায় এবার প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি রাজস্ব আদায় করতে হবে। ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জনে আগামী কয়েক বছরে রাজস্ব আদায় আরও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে হবে।
এনবিআরের সদস্য (মূসক বাস্তবায়ন) সৈয়দ মুসফিকুর রহমান আগামীর সময়কে বলেছেন, সরকার বাজেট সহায়তার জন্য আইএমএফের সঙ্গে ঋণচুক্তি করতে চায়। এ চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো। এ লক্ষ্য সামনে রেখে এনবিআর কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে।
তিনি বললেন, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংকটের কারণে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এখনো প্রত্যাশিত গতি পায়নি। ফলে রাজস্ব আদায়েও কিছুটা ধীরগতি রয়েছে। তবে রাজস্ব বাড়াতে এনবিআর কাজ করছে। আগামী ডিসেম্বর থেকে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের উত্থান হবে বলে তিনি আশা করছেন।
আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সফর সামনে রেখে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা জোরদার করেছে এনবিআর। এর অংশ হিসেবে সংস্থাটির আবাসিক প্রতিনিধি ম্যাক্সিম ক্রিসপো গত মঙ্গলবার এনবিআর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নের কৌশল তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, কোন কোন খাত থেকে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করা হবে, নতুন করদাতা শনাক্ত ও করজাল সম্প্রসারণে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং রাজস্ব প্রশাসনের অটোমেশনে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে, তা জানতে চেয়েছে আইএমএফ। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের সময়সীমা, সম্ভাব্য ফলাফলসহ সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করার কথাও বলা হয়েছে।
এর আগে রাজস্ব বাড়ানোর বিষয়ে এনবিআরের পাঠানো প্রতিবেদনকে পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা হিসেবে গ্রহণ করেনি আইএমএফ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ওই প্রতিবেদনে চলতি অর্থবছরের বিভিন্ন উদ্যোগের বিবরণ থাকলেও পরবর্তী অর্থবছরগুলোতে রাজস্ব বাড়ানোর কৌশল যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। নতুন রাজস্বের উৎস চিহ্নিত করা, করজাল সম্প্রসারণে আইনি ও প্রশাসনিক পরিবর্তন এবং ডিজিটাল অটোমেশন বাস্তবায়নের সময়সীমা নিয়েও বিস্তারিত পরিকল্পনার ঘাটতি ছিল। এ নিয়ে অসন্তোষ জানিয়ে ইমেইলে অর্থ মন্ত্রণালয়কে মতামত দিয়েছে আইএমএফ।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, বৈদেশিক ঋণের চেয়ে অভ্যন্তরীণ সংস্কারে গতি আনা বেশি জরুরি। তার মতে, এনবিআর পুনর্গঠনে দৃশ্যমান অগ্রগতি এবং রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর কার্যকর কৌশল ছাড়া শুধু ঋণ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক দুর্বলতা কাটানো সম্ভব নয়। ঋণের অর্থ ব্যবহারের পাশাপাশি করজাল সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও করফাঁকি প্রতিরোধে সরকারের স্বচ্ছ ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ১০ জুন ২০২৬ প্রকাশিত সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপির আকার ছিল ৬১ লাখ ২০ হাজার ২০৯ কোটি টাকা। বর্তমান রাজস্ব আদায়ের তুলনায় ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা দ্বিগুণের বেশি। ফলে এ লক্ষ্য অর্জনে রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কার ও করব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়ানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।



