সাক্ষাৎকার
রূপান্তরের অংশীদার হিসেবে অবদান রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ

মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ, সিইও, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি)
প্রশ্ন: নিজস্ব কিউআর থাকার পরও বাংলা কিউআর কেন? আগের ব্যবস্থার দুর্বলতা কী ছিল?
উত্তর: মূল উদ্দেশ্য ডিজিটাল পেমেন্টকে সমন্বিত ও আন্তঃপরিচালনযোগ্য ইকোসিস্টেমে রূপান্তর করা। আগে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব কিউআর চালাত, যা শুধু তাদের গ্রাহকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে এক অ্যাপ দিয়ে অন্যের কিউআর স্ক্যান করা যেত না। মার্চেন্টদের একাধিক কিউআর রাখতে হতো, আর গ্রাহকদেরও পোহাতে হতো নানা অসুবিধা। অভিন্ন বাংলা কিউআর একক জাতীয় মানদণ্ড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এসব জটিলতা দূর করে লেনদেনকে সহজ ও নিরাপদ করেছে।
প্রশ্ন: জাতীয় কিউআর চালুর ফলে গ্রাহক, ব্যবসায়ী এবং ব্যাংক— এই তিন পক্ষ কীভাবে লাভবান হবে?
উত্তর: এটি পেমেন্টকে সাশ্রয়ী ও সর্বজনীন করবে। গ্রাহকরা যেকোনো অ্যাপস দিয়ে যেকোনো মার্চেন্টকে সহজে অর্থ দিতে পারবেন। মার্চেন্টরাও একাধিক কিউআরের বদলে একটি দিয়েই পেমেন্ট নিতে পারবেন, এতে হিসাবরক্ষণ সহজ হবে। অন্যদিকে, ব্যাংকগুলোর জন্য এটি নতুন গ্রাহক সংযুক্তির সুযোগ তৈরি করবে। ব্যয়বহুল পিওএস (POS)-নির্ভরতা কমিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দ্রুত ও কম খরচে ডিজিটাল পেমেন্টে আনা সম্ভব হবে।
প্রশ্ন: ডিজিটাল লেনদেনে বাংলা কিউআরকে কি ‘গেম চেঞ্জার’ বলা যায়? এর পেছনের কারণ কী?
উত্তর: অবশ্যই। এটি পেমেন্ট গ্রহণে প্রচলিত হার্ডওয়্যারনির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও একটি কিউআর স্ট্যান্ড দিয়েই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সহজে পেমেন্ট নিতে পারবেন। ফলে শুধু শহর নয়, প্রত্যন্ত অঞ্চলের ব্যবসায়ীরাও স্বল্প খরচে ডিজিটাল অর্থনীতির অংশ হবেন। এর মাধ্যমে দেশ জুড়ে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বিস্তৃত হবে, লেনদেনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে এবং ক্যাশলেস অর্থনীতির মজবুত ভিত্তি আরও সুদৃঢ় হবে।
প্রশ্ন: নতুন এই কিউআর চালুর পর ব্যাংক খাতের ব্যবসায়িক কৌশল ও প্রতিযোগিতায় কী পরিবর্তন আসবে?
উত্তর: ব্যাংক খাতে এটি মৌলিক পরিবর্তন আনবে। এতদিন মূল প্রতিযোগিতা ছিল কে বেশি মার্চেন্টের কাছে নিজস্ব কিউআর বা পিওএস বসাচ্ছে। ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতার প্রধান ভিত্তি হবে উন্নত গ্রাহক অভিজ্ঞতা, ডিজিটাল অ্যাপ, দ্রুত সেটেলমেন্ট ও মূল্য সংযোজনকারী সেবা প্রদান। প্রতিযোগিতা শুধু অবকাঠামোতে সীমাবদ্ধ না থেকে উন্নত প্রযুক্তি, সেবার মান ও ধারাবাহিক উদ্ভাবনের দিকে ধাবিত হবে।
একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পেমেন্ট ইকোসিস্টেম গড়ে উঠবে
মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক
প্রশ্ন: একটি মাত্র কিউআর স্ক্যান করে সব ব্যাংক বা এমএফএস থেকে পেমেন্ট নেওয়ার চ্যালেঞ্জ কী?
উত্তর: এর মূল দর্শন হলো আন্তঃপ্রতিষ্ঠান লেনদেন বা ইন্টারঅপারেবিলিটি সক্ষম করা। ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ ও আন্তঃসংযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে সবাই একই ইকোসিস্টেমে যুক্ত হবে। তবে এর সফল বাস্তবায়ন পুরোপুরি নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানগুলোর সময়োপযোগী প্রযুক্তিগত সংযুক্তি, শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা, নিরবচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক এবং কার্যকর সমন্বয়ের ওপর। এসব নিশ্চিত করা গেলেই ব্যবস্থাটি সর্বজনীন হবে।
প্রশ্ন: ক্যাশলেস সমাজ বিনির্মাণ এবং নগদ লেনদেন কমাতে বাংলা কিউআর কতটা ভূমিকা রাখবে?
উত্তর: আমাদের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র লেনদেনের পরিমাণ অনেক বেশি, যার সিংহভাগ নগদে হয়। পিওএস স্থাপনের উচ্চ ব্যয়ের কারণে বিপুল ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ডিজিটাল পেমেন্টের বাইরে ছিলেন। বাংলা কিউআর সেই প্রতিবন্ধকতা দূর করে স্বল্প ব্যয়ে পেমেন্ট গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করবে। ফলে ব্যবসায়ীদের পেমেন্ট গ্রহণ সহজ হবে, নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং লেনদেনের পরিধি দেশ জুড়ে বিস্তৃত হয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়বে।
প্রশ্ন: সাধারণ মানুষ বা গ্রাহকদের এই নতুন কিউআর ব্যবস্থায় অভ্যস্ত করতে কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন?
উত্তর: সফল বাস্তবায়নের জন্য গ্রাহকের অভ্যাসে পরিবর্তন আনা জরুরি। এ লক্ষ্যে ব্যাপক সচেতনতা বৃদ্ধি, ক্যাশব্যাক, রিওয়ার্ড প্রোগ্রাম ও প্রচারণামূলক উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে গ্রাহকরা নিয়মিত ডিজিটাল পেমেন্টে উৎসাহিত হন। একই সঙ্গে মার্চেন্টদের জন্য সহজ অনবোর্ডিং, প্রতিযোগিতামূলক লেনদেন ব্যয় এবং প্রণোদনার ব্যবস্থা থাকবে। আমাদের লক্ষ্য গ্রাহক ও মার্চেন্ট সবার নিয়মিত ও টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা।
প্রশ্ন: ডিজিটাল লেনদেনে বড় ভয়ের জায়গা নিরাপত্তা। বাংলা কিউআরের ক্ষেত্রে অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কী থাকছে?
উত্তর: নিরাপত্তাই এখানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে তৈরি হওয়ায় এতে উন্নত এনক্রিপশন প্রযুক্তি, নিরাপদ অথেনটিকেশন এবং সার্বক্ষণিক
লেনদেন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা রয়েছে। এর পাশাপাশি অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোর নিজস্ব সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো এবং কেন্দ্রীয় পেমেন্ট অবকাঠামোর নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রাহকের লেনদেনের সর্বোচ্চ সুরক্ষা ও গভীর আস্থা নিশ্চিত করতে নিরলস কাজ করবে।
প্রশ্ন: অভিন্ন ব্যবস্থা কি ব্যাংক ও এমএফএসগুলোর মধ্যকার ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতাকে সংকুচিত করে ফেলবে?
উত্তর: না, এটি প্রতিযোগিতা কমাবে না; বরং প্রতিযোগিতাকে আরও ইতিবাচক ও গ্রাহককেন্দ্রিক করবে। অভিন্ন অবকাঠামোর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতা এখন কিউআর স্থাপনের পরিবর্তে সেবার মান উন্নয়ন, গ্রাহক অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধকরণ এবং উদ্ভাবনী আর্থিক সেবার ওপর কেন্দ্রীভূত হবে। এটি মূলত একটি সহযোগিতামূলক ইকোসিস্টেম গড়বে, যেখানে সবাই উদ্ভাবন ও উৎকর্ষের মাধ্যমে বাজারে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য তৈরি করবে।
প্রশ্ন: আগামী পাঁচ বছরের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বাংলা কিউআর কোন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে মনে করেন?
উত্তর: প্রত্যাশা করছি, আগামী পাঁচ বছরে এটি দেশের দৈনন্দিন লেনদেনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হবে। পাড়ার দোকান থেকে বৃহৎ ব্যবসা— সব পর্যায়েই ডিজিটাল পেমেন্ট বাড়বে এবং নগদনির্ভরতা কমবে। দেশে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পেমেন্ট ইকোসিস্টেম গড়ে উঠবে, যেখানে সবাই উপকৃত হবেন। ইউসিবি এই রূপান্তরের অংশীদার হিসেবে উদ্ভাবনী সমাধানের মাধ্যমে অর্থনীতির বিকাশে অবিরাম অবদান রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।




