অর্থ বিভাগের প্রতিবেদন
শিল্প-কৃষি প্রবৃদ্ধিতে বড় ধসের শঙ্কা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত অন্যতম প্রধান নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। এক্ষেত্রে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি তিন চ্যানেলের মাধ্যমে আঘাত হানবে অর্থনীতিতে। এগুলো হলে মূল্যস্ফীতি, উৎপাদন এবং লেনদেনের ভারসাম্যতে প্রভাব পড়বে। ফলে সামগ্রিক মোট দেশজ উৎপাদনসহ (জিডিপি) প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক সূচকগুলোতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
গত ১২ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সঙ্গে ‘সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতির’ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। সেই প্রতিবেদনে এমন আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছে অর্থ বিভাগ।
ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের (এমন একধরনের তেল, যার দামের ওপর বিশ্ববাজারে তেলের দাম নির্ভর করে) মূল্য ভিত্তিরেখা থেকে ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে গেছে। প্রতি ব্যারেল ১২৬ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে— উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।
বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০২৬ সালে জ্বালানির দাম গড়ে ২৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এক্ষেত্রে ২০২৫ সালের গড় মূল্য ব্যারেলপ্রতি ছিল ৬৯ মার্কিন ডলার। সেখানে ২০২৬ সালে বেড়ে ব্যারেলপ্রতি গড় মূল্য দাঁড়াতে পারে ৮৬ মার্কিন ডলারে। এ ছাড়া ডিজেলের দাম প্রতি ডলার ৭৫ দশমিক ৭৯ থেকে বেড়ে ২৩১ দশমিক ৩৯ ডলারে পৌঁছে। তেলের দামের এই আকস্মিক অভিঘাত অর্থনীতির প্রায় সব খাতেই পড়ছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ইকোনমিক আপডেট অ্যান্ড আউটলুক’-এর প্রতিবেদনে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন বলেছেন, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। এই বৃদ্ধির চাপ এখন আর শুধু খাদ্যপণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি হচ্ছে মূলত খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়া প্রভাবও কাজ করছে।
‘খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির জন্য জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং ক্রমবর্ধমান আমদানি ব্যয় দায়ী। এটি চাহিদাভিত্তিক ঘটনা না হয়ে সরবরাহভিত্তিক ও আমদানি ব্যয়চালিত একটি মূল্যস্ফীতি প্রক্রিয়া হিসেবে নির্দেশ করে’ উল্লেখ করেন এই অর্থনীতিবিদ।
অর্থ বিভাগের ঝুঁকি মূল্যায়নে বলা হয়েছে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাতে প্রকৃতি জিডিপি মূল প্রক্ষেপণের নিচে নেমে যেতে পারে, যা আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রক্ষেপণের বিপরীতে প্রকৃত অর্জন কমে গিয়ে দাঁড়াতে পারে আনুমানিক ৫ দশমিক ৯ শতাংশে। এ ছাড়া ২০২৮-২৯ অর্থবছরে সাড়ে ৭ শতাংশ প্রক্ষেপণের বিপরীতে হতে পারে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ।
আরও উল্লেখ করা হয়, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যমান মূল্যের চেয়ে জ্বালানি তেলের দাম ৩০ শতাংশ বাড়লে তা বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির চলমান ধারাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে। এক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির হারকে সাড়ে ৭ শতাংশ ভিত্তিরেখা থেকে বাড়িয়ে ৯ দশমিক ১ শতাংশে নিয়ে যাবে। মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে দীর্ঘদিন উচ্চহারে বজায় থাকায় মধ্যমেয়াদি প্রবৃদ্ধির গতিধারার জন্য প্রকট নিম্নমুখী ঝুঁকি তৈরি করে। মূল্যস্ফীতির আকস্মিক অভিঘাত প্রবৃদ্ধিতে আঘাত হানে। এটি মূলত ব্যবসায়িক আত্মবিশ্বাসকে ক্ষুণ্ন করে। বিনিয়োগের প্রকৃত রিটার্ন কমিয়ে দেয়। মানুষের পারিবারিক ক্রয়ক্ষমতাকে সংকুচিত করে এবং সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের অংশীজনদের জন্য নীতি পরিকল্পনা প্রণয়নে অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
প্রতিবেদনে খাতভিত্তিক অভিঘাত দেখলে দেখা যায়, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধির হার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল প্রক্ষেপণ ৭ দশমিক ০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। ২০২৮-২৯ অর্থবছর পর্যন্ত এই বড় ব্যবধান বজায় থাকবে, যেখানে প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ০ শতাংশের ভিত্তিরেখার বিপরীতে ৬ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছাবে।
একইভাবে, কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধির সংকোচনের মুখোমুখি হবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৫ শতাংশের মূল প্রক্ষেপণ থেকে কমে ৩ দশমিক ০ শতাংশে দাঁড়াবে এবং ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ মূল প্রক্ষেপণের তুলনায় কমে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে স্থবির থাকবে। জ্বালানি তেলের মূল্যের অস্থিরতার পরিপ্রেক্ষিতে উৎপাদন-নিবিড় খাতগুলোর সংবেদনশীলতা বা নাজুকতা স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা যাচ্ছে। পরিচালন ও উপকরণের ব্যয় বৃদ্ধি প্রক্ষেপণ মেয়াদ জুড়ে অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের গতি ক্রমাগতভাবে বাধাগ্রস্ত করবে।
অর্থ বিভাগ বলছে, লেনদেন ভারসাম্যের ওপর ব্যাপক প্রভাব থাকবে জ্বলানির মূল্যবৃদ্ধি। আগামী অর্থবছরে জ্বালানি তেলের অভিঘাত বাংলাদেশের বহিঃখাতের সূচকগুলোতে উল্লেখযোগ্য ও দীর্ঘস্থায়ী অবনমন ঘটাবে। বাণিজ্য ঘাটতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জিডিপির -৬ দশমিক ৯ শতাংশের মূল প্রক্ষেপণ থেকে আরও বেড়ে ৭ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছাতে পারে এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছর নাগাদ তা ৭ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে ১০ দশমিক ০ শতাংশে গিয়ে দাঁড়াবে, যেখানে এর মূল প্রক্ষেপণ হলো ৬ দশমিক ৮ শতাংশ।
এই চাপ চলতি হিসাবের ভারসাম্যের ওপরও প্রভাব বিস্তার করবে। ২০২৮-২৯ অর্থবছর নাগাদ ঘাটতি মূল প্রক্ষপণের স্তরে পৌঁছাতে ব্যর্থ হবে। ফলে বর্ধিত আমদানি ব্যয় দেশের মোট আন্তর্জাতিক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে। এ কারণে ২০২৮-২৯ অর্থবছর নাগাদ রিজার্ভের প্রক্ষেপিত পরিমাণ দাঁড়াবে ৫২ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা ৬২ দশমিক ৬ বিলিয়নের মূল প্রক্ষেপণ থেকে ৯ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি বড় ঘাটতি।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধি লেনদেন ভারসাম্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে এই খাতটির জন্য বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বাজেটে বরাদ্দ করা পরিমাণের চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় ভর্তুকির প্রয়োজন হয়েছে। এ কারণে সরকারের ওপর অতিরিক্ত এবং অনভিপ্রেত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে।
আরও প্রভাব পড়বে রাজস্ব আয়ের ওপর। কেননা সরকারি রাজস্ব আয়ের ওপর মূল্যস্ফীতির একটি আকস্মিক অভিঘাতের দ্বিমুখী এবং আংশিক প্রতিসাম্যমূলক প্রভাব রয়েছে। এদিকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় মানুষের পারিবারিক ভোগের ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে। পাশাপাশি আর্থিক ভারসাম্যর ওপর প্রভাব ফেলবে।






