৪ কারণে এত লোডশেডিং
- দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা গ্যাসসংকটের প্রভাব বিদ্যুতে
- সোমবার মধ্যরাতে স্মরণকালের সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫১২ মেগাওয়াট লোডশেডিং
- চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একটির সঙ্গে আরেকটির সম্পর্ক। গ্যাসের সঙ্গে বিদ্যুতের। গ্যাস দিয়েও বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। এ কারণে দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা গ্যাসসংকটের প্রভাব পড়েছে বিদ্যুতে। আর এজন্য বেড়েছে লোডশেডিং। গত সোমবার মধ্যরাতে দেশে স্মরণকালের সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫১২ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। এই গরমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় জেরবার জনজীবন। গ্যাস আর বিদ্যুৎ— দুটোর সংকটে থেমে যাচ্ছে কারখানার চাকা।
মূলত চার কারণে লোডশেডিং বেড়েছে। জ্বালানি সংকটে এমনিতেই চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় না, এর সঙ্গে এলএনজি টার্মিনালে ত্রুটির কারণে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে— এটি প্রথম কারণ। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ ও যান্ত্রির ত্রুটি। সম্প্রতি নানা কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধিও আরেক কারণ। আর শেষটি হচ্ছে অর্থসংকট।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানালেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে দৈনিক ন্যূনতম ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস দরকার। কিছুদিন আগেও পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু এখন তা ৬৭ কোটি ঘনফুটে নেমেছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
এ সংকটের পাশাপাশি গরম বেড়ে যাওয়া এবং গ্যাসসংকটে বৈদ্যুতিক চুলার ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে বেড়েছে চাহিদা। এতে লোডশেডিংও বেড়ে গেছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যুতের ঘাটতি কমাতে ব্যয়বহুল তেলচালিত কেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এসব কেন্দ্র বেশি সময় চালানো যাচ্ছে না, তাতে ভর্তুকি অস্বাভাবিক হারে বাড়বে। ফলে আপাতত পিডিবির হাতে বিকল্প নেই।
বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হলে লোডশেডিং কিছুটা কমবে। কিন্তু পুরোপুরি মুক্ত হওয়া আপাতত সম্ভব নয়। কারণ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি এবং অর্থের সংকট রয়েছে। তবে আবহাওয়া ঠান্ডা থাকলে চাহিদা কমে গেলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
উৎপাদন পরিস্থিতি: দেশে এখন বিদ্যুতের চাহিদা গড়ে ১৬-১৭ হাজার মেগাওয়াট। উৎপাদন হচ্ছে ১৪-১৫ হাজার মেগাওয়াটের মতো। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও জ্বালানিসহ নানা সংকটে তা সম্ভব হচ্ছে না। গতকাল বুধবার মধ্যরাতে ২ হাজার ৯৭০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে। তবে ছুটির দিন এবং বৃষ্টির কারণে চাহিদা কম হওয়ায় সকাল থেকে লোডশেডিং কমতে থাকে।
বর্তমানে সবচেয়ে সাশ্রয়ী গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার ১৫৪ মেগাওয়াট। এজন্য দৈনিক অন্তত ২১৪ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু গ্যাসসংকটের কারণে কখনই চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়নি এসব কেন্দ্র থেকে। কিছুদিন আগে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র থেকে সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হলেও এখন তা গড়ে সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াটে নেমেছে।
অন্যদিকে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ৭ হাজার ৯৪৫ মেগাওয়াট। উৎপাদন হচ্ছে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান আদানিই প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। তাদের বকেয়া পরিশোধের গতি বাড়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহও বেড়েছে। বকেয়া পরিশোধে সন্তোষ প্রকাশ করে চাহিদা অনুযায়ী সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানটি।
এদিকে কারিগরি ত্রুটির কারণে পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমেছে ৫০০ মেগাওয়াটেরও বেশি। ৮ থেকে ১০ আগস্টের মধ্যে এটি আবার উৎপাদনে ফেরার কথা রয়েছে। বড়পুকুরিয়ায় দেশীয় কয়লা থেকেও উৎপাদন হচ্ছে কম, তিনটির মধ্যে দুটি ইউনিট বন্ধ রয়েছে কারিগরি ত্রুটির কারণে।
ঘাটতি সামাল দিতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবহার বেড়েছে। এ ধরনের কেন্দ্রের সক্ষমতা ৬ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট হলেও উৎপাদন হচ্ছে ৩ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট পর্যন্ত।
তেলচালিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় ব্যয় ২০ টাকার কাছাকাছি। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের গড় ব্যয় সাড়ে ৩ টাকার মতো।
পিডিবির কর্মকর্তারা জানালেন, অনেক বেসরকারি তেলচালিত কেন্দ্র সীমিত জ্বালানি মজুদ নিয়ে চলছে। কোনো কোনো কেন্দ্র রাত ১০টা বা ১২টা পর্যন্ত উৎপাদন ধরে রাখলেও পরে তা কমিয়ে দেয়। কারণ বিল পরিশোধে দেরি হওয়ায় অনেক কেন্দ্র নতুন করে জ্বালানি কিনতেও সমস্যায় পড়ছে।
লোডশেডিংয়ের প্রভাব: ঢাকা ও বড় শহরগুলোতে লোডশেডিং কিছুটা কম থাকলেও গ্রামাঞ্চলে ১০-১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। কোথাও টানা দু-তিন ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন। কিছু এলাকায় সারা দিনে বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫ ঘণ্টা।
বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবনে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও হাসপাতালে ভর্তি রোগীরা বড় বিপাকে রয়েছে। শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় ব্যাঘাত ঘটছে। অটোরিকশাচালক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আয় কমেছে। শিল্পকারখানায় গ্যাসসংকটের পাশাপাশি বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ব্যয় বাড়ছে। ছুটি ঘোষণা করেছে অনেক কারখানার মালিক। ব্যবসায়ীদের লোকসান বাড়ছে। পর্যটনকেন্দ্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
চিন্তিত সরকার, পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা: বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রেখে যাওয়া বিপুল পরিমাণ বকেয়া ও ঋণের দায় চেপেছে বর্তমান সরকারের ওপর। ফলে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
পিডিবির কাছে সরকারি-বেসরকারি কোম্পানিগুলোর বিল পাওনা প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পাবে ১৭ হাজার কোটি টাকার মতো।
বকেয়া আদায়ে বেসরকারি কেন্দ্রের মালিকরা চাপ দিচ্ছেন। জ্বালানি কেনার অর্থ নেই এমন দাবি করে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে না তারা। আবার এত বিশাল বকেয়া পরিশোধেরও সামর্থ্য এ মুহূর্তে সরকারের নেই। অন্যদিকে লোডশেডিং সামাল দিতে না পারলে জনরোষ বাড়বে। বিদ্যুতের এ সংকট চিন্তায় ফেলেছে সংশ্লিষ্টদের।
কর্মকর্তারা বলছেন, ভর্তুকির চাপ কমাতে জুনে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে পিডিবির আয় বাড়বে এবং নতুন করে আর বকেয়া বাড়বে না। তবে পুরনো বকেয়া শোধ করতে আরও সময় লাগবে। আর তেলচালিত কেন্দ্র না চালালে ভর্তুকির ওপর চাপ কমে আসবে।
আওয়ামী লীগের দেড় দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা বেড়েছে ৫ গুণের বেশি, উৎপাদন বেড়েছে ৩ দশমিক ৬ গুণ। আর ক্যাপাসিটি চার্জ (কেন্দ্রভাড়া) বেড়েছে ১৬ গুণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে জ্বালানি নিশ্চিত না করেই একের পর এক অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করেছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। অর্ধেকের মতো সক্ষমতা অলস পড়ে থাকে।
চুক্তি অনুসারে বিদ্যুৎ উৎপাদন করুক আর না করুক প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে নির্দিষ্ট কেন্দ্রভাড়া পরিশোধ করতে হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ভাড়া নিয়েছে ৪৪ হাজার কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে।




