গ্যাসসংকটে কোথাও ছুটি কোথাও বন্ধ মেশিন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির মতো; টানা চার দিনের ছুটি পেয়েছেন দেশের কয়েকটি এলাকার পোশাককর্মীরা। জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের সরকারি ছুটির সঙ্গে বৃহস্পতিবার যোগ করে শুক্র-শনিবারসহ তাদের এই ছুটি। পূর্বপরিকল্পনা না থাকলেও পোশাককর্মীদের কাজে এই বিরতি মিলেছে গ্যাসের অভাবে। কারখানার চাকা যেহেতু ঘুরছেই না, তাই ছুটিই সই; এমন ভাবনা থেকেই মালিকদের এ সিদ্ধান্ত।
গতকাল বুধবার গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর শিল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেল গ্যাসসংকটের কারণে কেমন বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে কারখানাগুলো। মালিক-কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাসসংকটের কারণে বেশিরভাগ শিল্পকারখানার উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে গেছে। এই সংকট যদি আরও লম্বা হয়, তাহলে ছাঁটাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হবে শ্রমিকদের।
গাজীপুর: গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে জেলার রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানাগুলোয় নেমে এসেছে স্থবিরতা। কমছে উৎপাদন, বাড়ছে দেনা। এতদিন উৎপাদন সচল রাখতে বিভিন্ন কৌশল নিতেন শিল্পকারখানার মালিকরা। এর মধ্যে কোথাও কিছু উৎপাদন লাইন বন্ধ রাখা, কোথাও মেশিনের সংখ্যা কমিয়ে চালানো, আবার কোথাও রাতের শিফটে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছিল। এবার তার সঙ্গে যোগ হলো সরকারি ছুটির সঙ্গে মিল রেখে টানা ছুটি ঘোষণা। জেলার প্রায় ২০ শতাংশ কারখানায় সরকারি ছুটির সঙ্গে মিল রেখে টানা চার দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
গাজীপুর তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় সাড়ে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও বর্তমানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতির কারণেই শিল্পাঞ্চলের অধিকাংশ এলাকায় প্রয়োজনীয় চাপ বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে সকাল ও দিনের বেলায় উৎপাদন সবচেয়ে বেশি ব্যাহত হচ্ছে।
কোনাবাড়ীর জেলখানা রোড এলাকার শামসুল আল আমিন গ্রুপের ফুয়াদ স্পিনিং মিলসের মহাব্যবস্থাপক হাবিবুল হাসান বলছিলেন, ‘গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে উৎপাদন চালানো সম্ভব হচ্ছে না। ১০ শতাংশ উৎপাদনও যদি না করতে পারি, তাহলে শুধু লোকসানই হবে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে আবার কারখানা চালু করা হবে।’
দুই সপ্তাহ ধরে চলা তীব্র গ্যাসসংকটের কারণে ফুয়াদ স্পিনিং মিলস ছাড়াও গাজীপুরের ১৭টি তৈরি পোশাক ও বস্ত্র কারখানার ডায়িং (রঙ) সেকশন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এর বাইরে কিছু কারখানা উৎপাদন আংশিক বন্ধ রেখেছে। শুধু তাই নয়, অধিকাংশ কারখানার উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমেছে।
নারায়ণগঞ্জ: দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোর। শিল্প মালিকরা বলছেন, আগে যে পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যেত, তাতে মেশিন চালু রাখা যেত। কিন্তু এখন যে চাপ পাওয়া যাচ্ছে, তাতে মেশিন চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। মেশিন বন্ধ থাকায় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ হচ্ছে না। ফলে সময়মতো ক্রেতার কাছে পণ্য পাঠানো নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ ইয়ার্ন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (বিওয়াইএমএ) ও হাজী হাশেম স্পিনিং মিলস লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি) এম সোলায়মান বললেন, ‘সারা দেশে ৭০০ স্পিনিং মিল থাকলেও এখন প্রায় ১৫০টির মতো প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। আমার নিজের প্রতিষ্ঠানের টার্নওভার ৩০ শতাংশ কমে গেছে। যারা চলছে কেউ ৩০, কেউ ৪০, কেউ ৫০ শতাংশ লস দিয়ে ব্যবসা করছে।’
বিকেএমইএ সহসভাপতি (অর্থ) ও আরএস কম্পোজিট লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মো. মোরশেদ সারোয়ার সোহেল বলছিলেন, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের রপ্তানি খরচও বেড়ে গেছে। তিনি জানালেন, পুরো নারায়ণগঞ্জে ৫০০ প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে।
নরসিংদী: গ্যাসের নিম্নচাপ এবং ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে নরসিংদীর ছোট-বড় প্রায় এক হাজার শিল্প প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে শুধু নরসিংদীতে গত ১৮ দিনে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে, দাবি ব্যবসায়ীদের। তাদের শঙ্কা, বিদেশি ক্রেতারা সময়মতো পণ্য না পেলে কোটি কোটি ডলারের অর্ডার সরিয়ে নিতে পারেন। নরসিংদীর মাধবদী, শেকেরচর, চৌয়ালা এলাকার টেক্সটাইল, ডায়িং, নিটিং, স্পিনিং কারখানাগুলোতে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। নামমাত্র চালু রয়েছে কয়েকটি কারখানা। এ ছাড়া দেশীয় কাপড়ের যে ৭০ শতাংশের জোগান নরসিংদী দেয়, সেটিও আর সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন কারখানা মালিকরা।
নরসিংদীর আমানত শাহ গ্রুপ, পাকিজা গ্রুপ, জজ ভূঁইয়া গ্রুপ, আবেদ টেক্সটাইল, শিপলু স্পিনিং, তিথি গ্রুপ, এমএমকে ডায়িং ও চৌয়ালা এলাকায় মেসার্স ফকির সাইজিং মিলসহ অনেক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। মালিকরা বলছেন, গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় দামি যন্ত্রপাতি বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে কারখানা বন্ধ ঘোষণা করেছে। রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ তো করা যাচ্ছেই না, উল্টো গুনতে হচ্ছে লোকসান।
উৎপাদন স্থবিরতার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের ওপর। নিয়মিত কাজ না থাকায় অনেক কারখানা কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত কর্মী ছাঁটাই করছে। আবার অনেক জায়গায় কাজের সময় ও মজুরি কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছেন হাজারো শ্রমিক।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী প্রতিনিধি




