ভালো নেই সিমেন্ট খাত

প্রতীকী ছবি
দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সিমেন্ট খাতের অধিকাংশ কোম্পানির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক ও সংকটপূর্ণ। সার্বিক নির্মাণ খাতের মন্দা, বৈদেশিক মুদ্রার সংস্থানজনিত জটিলতা এবং তীব্র প্রতিযোগিতা এ খাতের কোম্পানিগুলোর আয়ের ধারাবাহিকতায় বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
প্রাতিষ্ঠানিক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বড় একটি অংশ এ খাতের শেয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। কারণ বেশিরভাগ কোম্পানির মুনাফায় বড় ধসের পাশাপাশি শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ও ডিভিডেন্ড প্রদানের সক্ষমতা কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ফলে একদিকে যেমন মূলধনী মুনাফা বা ক্যাপিটাল গেইনের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে, অন্যদিকে ডিভিডেন্ড প্রত্যাশী বিনিয়োগকারীদের জন্যও ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে।
বর্তমানে বার্ষিক ৮ থেকে ১০ কোটি টন সিমেন্ট উৎপাদন সক্ষমতার বিপরীতে দেশের প্রকৃত চাহিদা নেমে এসেছে মাত্র ৩.১ থেকে ৩.৮ কোটি টনে। ফলে বেশিরভাগ কারখানা তাদের মোট সক্ষমতার ৩০ শতাংশের কম ব্যবহার করে কোনোমতে উৎপাদন টিকিয়ে রেখেছে, যেখানে বৈশ্বিক মানদণ্ড ধরা হয় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ।
সরকার পরিবর্তনজনিত নীতি অনিশ্চয়তা, সরকারি অবকাঠামো প্রকল্প স্থগিত থাকা, বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ সংকোচন এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে ব্যাহত হচ্ছে ব্যক্তিগত আবাসন নির্মাণও। এর ওপর আমদানিনির্ভর কাঁচামাল ক্লিংকার, স্ল্যাগ ও জিপসামের উচ্চমূল্য এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খরচের ঊর্ধ্বগতি খাতটিকে আরও চাপে ফেলে দিয়েছে।
বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমএ) তথ্য বলছে, নিবন্ধিত ৭৭টি কোম্পানির মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৪২টি উৎপাদনে রয়েছে, যার মধ্যে শীর্ষ ১০টি কোম্পানিই প্রায় ৭৫ শতাংশ বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।
তবে মন্দার ধাক্কা সব কোম্পানির ওপর সমানভাবে পড়েনি। নিজস্ব কাঁচামালের উৎস বা কার্যকর পরিচালন দক্ষতার কারণে কিছু প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও অনেক কোম্পানি বড় ধরনের মুনাফা সংকোচন ও আর্থিক চাপের মুখোমুখি হয়েছে।
মেঘালয়ের নিজস্ব চুনাপাথরের খনি থেকে সিলেটের ছাতক কারখানায় সরাসরি কনভেয়র বেল্টে কাঁচামাল আনার সুবিধার কারণে লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ পিএলসি অন্য প্রতিযোগীদের তুলনায় ব্যয় সাশ্রয়ের সুবিধা পাচ্ছে। ২০২৩ সালে কোম্পানিটি সর্বোচ্চ ৫৯৪ কোটি টাকা নিট মুনাফা ও ৫০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছিল। ২০২৪ সালে মুনাফা চার বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামলেও ২০২৫ সালে আবারও ঘুরে দাঁড়ায়— নিট মুনাফা ৩৪ শতাংশ বেড়ে ৫১১ কোটি টাকায় পৌঁছায় এবং ১৮ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেয়। তবে ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকেও জ্বালানি খরচ ও মূল্যস্ফীতির চাপে নিট মুনাফা ১৯ শতাংশ কমে ১১২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
ক্রাউন সিমেন্ট পিএলসির ক্ষেত্রে ২০২৪ অর্থবছরে ৭৪.২৩ কোটি টাকা মুনাফা অর্জনের পর ২০২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটির নিট মুনাফা ৩৩ শতাংশ কমে ৬৭.১২ কোটি টাকায় নেমে আসে। তবুও কোম্পানিটি ২১ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকের হিসাব অনুযায়ী শেয়ার প্রতি আয় হয়েছে ৯১ পয়সা যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ২ টাকা ৩ পয়সা। শেয়ারবাজারে কোম্পানিটি বর্তমানে ৫৯ থেকে ৬১ টাকায় লেনদেন হচ্ছে।
উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও বিক্রি কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে হাইডেলবার্গ মেটেরিয়ালস বাংলাদেশ পিএলসির ওপর। কোম্পানিটি ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ২৫ শতাংশ করে ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিলেও ২০২৫ অর্থবছরে তা অর্ধেকেরও বেশি কমিয়ে মাত্র ১১ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে। ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকেও কোম্পানির মুনাফা ৫০ শতাংশ এবং অর্ধবার্ষিকে মুনাফা ৪৭ শতাংশ কমেছে। ছয় মাসের ব্যবধানে শেয়ারের দর প্রায় ১৯ শতাংশ কমে ২০৬ টাকায় লেনদেন হচ্ছে।
প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলস পিএলসি ২০২২ ও ২০২৩ অর্থবছরের টানা লোকসান কাটিয়ে ২০২৪ অর্থবছরে ৭৪.২৩ কোটি টাকা নিট মুনাফা করে ২১.৫ শতাংশ ডিভিডেন্ড দিয়েছিল। কিন্তু ২০২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে মুনাফা আবারও ৭৫ শতাংশ কমে মাত্র ১.৪৪ কোটি টাকায় নেমে আসে। তবে চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে শেয়ার প্রতি আয় হয়েছে ১ টাকা ৮০ পয়সা যা এর আগের বছর একই সময়ে ছিল ৩১ পয়সা। গত এক বছরে শেয়ারটি প্রায় ১৩ শতাংশ শেয়ার দর হারিয়েছে। বর্তমানে লেনদেন হচ্ছে ৪২ থেকে ৪৫ টাকায়। ব্যাংক ঋণের বোঝা কমাতে কোম্পানিটি ১৬১ কোটি টাকার প্রেফারেন্স শেয়ার ইস্যু করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
কনফিডেন্স সিমেন্ট পিএলসি-র ২০২৫ সালে নিট মুনাফা ৯৬ কোটি ৮৪ লাখ টাকায় উন্নীত হয় এবং ১০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করে। রাইট শেয়ার ইস্যুর পাশাপাশি নরসিংদীতে নতুন কারখানার জন্য ৮১৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে কোম্পানিটি। তবে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ডিভিডেন্ড পরিশোধে ব্যর্থতার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি কর্তৃক তলব পায় প্রতিষ্ঠানটি। পরবর্তীতে আর্থিক দায়বদ্ধতা সামলাতে ঢাকা-ভিত্তিক সাবসিডিয়ারি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে গত এক বছরে কোম্পানিটির শেয়ার দর প্রায় ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ৬১ থেকে ৬৩ টাকা লেনদেন হচ্ছে।
আরামিট সিমেন্ট পিএলসি চরম ব্যবসায়িক ও আর্থিক মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে লভ্যাংশ দিতে না পারা এবং কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকার কারণে কোম্পানিটি বর্তমানে 'জেড' ক্যাটাগরিতে লেনদেন হচ্ছে। ডিএসইতে এর শেয়ার ১১.১০ থেকে ১১.২০ টাকায় লেনদেন হচ্ছে। প্রায় ৩৪ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের এই কোম্পানিটির পুঞ্জীভূত লোকসান বর্তমানে ১০৬ কোটি টাকা।
মেঘনা সিমেন্ট মিলস পিএলসি চরম ব্যবসায়িক ও আর্থিক মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। টানা দুই বছর শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দিতে না পারার কারণে ‘এ’ ক্যাটাগরি থেকে নামিয়ে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে ডিএসইতে এর প্রতিটি শেয়ারের দাম ২৮.৩০ থেকে ২৯.৪০ টাকায় ওঠানামা করছে, যেখানে গত এক বছরে শেয়ারটির সর্বোচ্চ দাম উঠেছিল ৫২.০০ টাকা এবং সর্বনিম্ন নেমেছিল ২৬.১০ টাকা। প্রায় ৩২ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের এই কোম্পানিটির পুঞ্জীভূত লোকসান ও রিজার্ভের পরিমাণ বর্তমানে ঋণাত্মক ৩৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যার ফলে বসুন্ধরা গ্রুপের আওতাধীন এই প্রতিষ্ঠানটির মোট বাজার মূলধন কমে প্রায় ৮৯.৭১ কোটি টাকার ঘরে নেমে এসেছে।
শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সিমেন্ট খাতের বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করলে সাধারণ ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি অত্যন্ত সতর্কতার সময়। সামগ্রিক খাতের ওভারক্যাপাসিটি এবং চাহিদা মন্দার কারণে এ খাতের শেয়ারগুলোতে স্বল্পমেয়াদে বড় ধরনের গতিশীলতা বা মূলধনী মুনাফার সম্ভাবনা বেশ সীমিত। তবে কোম্পানিগুলোর মৌলিক ভিত্তি ও কৌশলগত সুবিধার পার্থক্যের কারণে বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে একটি ভিন্নধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি নেওয়া প্রয়োজন।



