জেএমআই হসপিটাল
উত্থানের স্বপ্ন দেখিয়ে পতন

সংগৃহীত ছবি
ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি, আকর্ষণীয় মুনাফা এবং ঋণ পরিশোধের রঙিন স্বপ্ন দেখিয়ে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় জেএমআই হসপিটাল রিক্যুইজিট ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেড। প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি শেয়ারবাজার থেকে ৭৫ কোটি টাকা উত্তোলন করে। উত্তোলিত এই অর্থে ভবন নির্মাণ, আধুনিক মেশিনারি ক্রয়, জমি উন্নয়ন, সাধারণ সুবিধা বৃদ্ধি, ঋণ পরিশোধ এবং আইপিও ব্যয় মেটানোর কথা ছিল। কিন্তু তালিকাভুক্তির পর কোম্পানিটির ব্যবসার পরিস্থিতি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশার বিপরীতে গিয়ে নিম্নমুখী হয়েছে।
কোম্পানিটি জানিয়েছিল, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিক্রি ৩২৭ দশমিক ৫২ কোটি টাকায় উন্নীত হবে এবং মুনাফা দাঁড়াবে ৭৯ দশমিক ৭২ কোটি টাকা। অথচ প্রকৃত পরিসংখ্যানে বিক্রি হয়েছে ১৬৭ কোটি টাকা এবং মুনাফা হয়েছে ২৩ দশমিক ৩১ কোটি টাকা, যা প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রার অনেক নিচে। চলতি অর্থবছরের (জুলাই ২০২৫-মার্চ ২০২৬) প্রথম ৯ মাসের চিত্রও হতাশাজনক। এ সময়ে শেয়ারপ্রতি মুনাফা হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৬৭ টাকা এবং মোট মুনাফা ৮ দশমিক ৩৯ কোটি টাকা। অথচ আগের অর্থবছরের একই সময়ে শেয়ারপ্রতি মুনাফা ১ দশমিক ৫৬ টাকা এবং মোট ১৯ দশমিক ৫৫ কোটি টাকা ছিল। অর্থাৎ, মুনাফা ধারাবাহিকভাবেই কমছে।
মুনাফার পাশাপাশি ঋণ কমানোর প্রতিশ্রুতি বাস্তবে মেলেনি। ২০২০ সালের ৩০ জুনের ১৪৮ দশমিক ৬৬ কোটি টাকার ঋণ ও লিজ দায় ২০২৫ সালের ৩০ জুনের মধ্যে ১৩ দশমিক ৬০ কোটি টাকায় নামানোর লক্ষ্যমাত্রা ছিল। বাস্তবে তা দাঁড়িয়েছে ১০৫ দশমিক ৩৩ কোটি টাকায়। অন্যদিকে শেয়ারবাজার থেকে উত্তোলিত ৭৫ কোটি টাকার মধ্যে ৭৩ দশমিক ৭৫ কোটি টাকাই জেএমআই গ্রুপের অন্য পাঁচটি সংস্থাকে দেওয়া হয়েছে। আর্থিক প্রতিবেদনে এই অর্থকে ‘অনিরাপদ’ হিসেবে দেখানো হয়েছে, যার ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা চরম ঝুঁকিতে পড়েছেন।
প্রতিষ্ঠানটি স্টার্টআপ খরচ হিসাবে প্রায় ৮ দশমিক ৮২ কোটি টাকা মূলধনি কাজ (সিডব্লিউআইপি) দেখিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক হিসাবমান আইএএস-১৬-এর নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়
তালিকাভুক্তির পর থেকে ধারাবাহিকভাবে লভ্যাংশ কমিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য মাত্র ৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়েছে। কাট-অফ মূল্যের ভিত্তিতে এটি মাত্র ২ শতাংশ রিটার্ন দেয়, অথচ ব্যাংকে এফডিআর করলেও কমপক্ষে ১০ শতাংশ লাভ পাওয়া যেত। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন ২০২০ সালের ৩০ জুলাই কোম্পানির আইপিও বাতিল করেছিল। কারণ কোম্পানিটি একই গ্রুপের অন্য কোম্পানিকে বিপুল ঋণ দিয়েছিল এবং আন্তঃকোম্পানি লেনদেনের মাধ্যমে মুনাফা কৃত্রিমভাবে দেখানোর সুযোগ থাকায় উদ্বেগ ছিল। পরে আবার কীভাবে আইপিও অনুমোদন পেল, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন জানিয়েছেন, শেয়ারবাজারে এমন অনেক ভুয়া কোম্পানিকে কৃত্রিম হিসাব দেখিয়ে আইপিওতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
আইপিওর পাশাপাশি অডিটেও বড় ধরনের হিসাবগত গরমিল ধরা পড়েছে। নিরীক্ষায় দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি স্টার্টআপ খরচ হিসাবে প্রায় ৮ দশমিক ৮২ কোটি টাকা মূলধনি কাজ (সিডব্লিউআইপি) দেখিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক হিসাবমান আইএএস-১৬-এর নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ ছাড়া ভাড়াসংক্রান্ত বেশ কিছু খরচ আইএফআরএস-১৬ নীতির পরিপন্থী হওয়ায় তা যথাযথভাবে স্বীকৃত হয়নি।
এসব অনিয়মের বিষয়ে কোম্পানির সচিব শফিকুর রহমান জানালেন, তাদের নির্ধারিত জনসংযোগ প্রতিষ্ঠান অর্ন কমিউনিকেশন আনুষ্ঠানিক মন্তব্যের ব্যবস্থা করবে। তবে শেষ পর্যন্ত জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি শরিফুল ইসলামের সঙ্গে কয়েক দফায় যোগাযোগ করা হলেও তাদের কাছ থেকে কোনো কার্যকর মন্তব্য পাওয়া যায়নি।




