নিরীক্ষকের প্রতিবেদন
অগ্রণী ইন্স্যুরেন্সের সম্পদের হিসাবে গলদ

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত অগ্রণী ইন্স্যুরেন্স পিএলসির সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও হিসাব সংরক্ষণে বড় ধরনের দুর্বলতা পেয়েছে নিরীক্ষক। কোম্পানির স্থায়ী সম্পদের বিস্তারিত তথ্য সংবলিত যথাযথ নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রার নেই। এমনকি সম্পদগুলো সঠিকভাবে শনাক্ত ও ট্র্যাক করার জন্য কোনো স্বতন্ত্র শনাক্তকরণ কোডও বরাদ্দ করা হয়নি। ফলে কোম্পানির সম্পদের প্রকৃত অস্তিত্ব, অবস্থান ও হিসাব যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত হিসাববছরের আর্থিক বিবরণী নিরীক্ষা করে এসব তথ্য তুলে ধরেছেন নিরীক্ষক।
প্রতিবেদনে বিষয়টিকে হিসাবরক্ষণ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নিরীক্ষকের মতে, এ ধরনের রেকর্ড সংরক্ষণ না করা আন্তর্জাতিক হিসাবমান আইএএস ১৬-এর পরিপন্থী। তালিকাভুক্ত একটি বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে এমন দুর্বলতা আর্থিক প্রতিবেদনের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
সম্পদ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি কোম্পানির আর্থিক কাঠামোতেও দুর্বলতা পেয়েছে নিরীক্ষক। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) বিধান অনুযায়ী, জীবনবীমা ছাড়া অন্যান্য বীমা কোম্পানির ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ৪০ কোটি টাকা হতে হয়। কিন্তু ২০২৫ সাল শেষে অগ্রণী ইন্স্যুরেন্সের পরিশোধিত মূলধন রয়েছে ৩৬ কোটি ১ লাখ ৮৬ হাজার ৯৮০ টাকা। অর্থাৎ, নির্ধারিত সীমার চেয়ে কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধনে ঘাটতি রয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৯৮ লাখ ১৩ হাজার টাকা।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের শেয়ার ধারণ নিয়েও আপত্তি জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী, এ ধরনের বীমা কোম্পানিতে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে অন্তত ৬০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অথচ অগ্রণী ইন্স্যুরেন্সে তাদের সম্মিলিত শেয়ার রয়েছে মাত্র ২৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
এর বাইরে কোম্পানিটির সহযোগী প্রতিষ্ঠান অগ্রণী ইন্স্যুরেন্স সিকিউরিটিজ লিমিটেডের আগের হিসাবের ভুল শ্রেণিবিন্যাসের তথ্যও নিরীক্ষায় উঠে এসেছে। কনসোলিডেটেড আর্থিক বিবরণীর নোট অনুযায়ী, ২০২১ সালে ট্র্যাক লাইসেন্স বাবদ ১ কোটি টাকা মূলধনি ব্যয়ের পরিবর্তে রাজস্ব ব্যয় হিসেবে দেখানো হয়েছিল। পরে আইএএস-৮ অনুযায়ী ওই ভুল সংশোধন করে পূর্ববর্তী আর্থিক বিবরণী পুনর্নির্ধারণ করা হয়।
স্থায়ী সম্পদের বিস্তারিত তথ্য সংবলিত যথাযথ নিবন্ধন নেই। সম্পদ শনাক্ত ও ট্র্যাক করার জন্য স্বতন্ত্র শনাক্তকরণ কোডও বরাদ্দ করা হয়নি
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের জন্য ঘোষিত বোনাস লভ্যাংশের মাধ্যমে কোম্পানিটি পরিশোধিত মূলধন ২ কোটি ৩ লাখ ৮৭ হাজার ৯৪০ টাকা বাড়িয়েছে, যার ফলে মোট পরিশোধিত মূলধন দাঁড়িয়েছে ৩৬ কোটি ১ লাখ ৮৬ হাজার ৯৮০ টাকা। মূলধন বৃদ্ধির এ-সংক্রান্ত কাগজপত্র যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তরে (আরজেএসসি) জমা দিয়ে কোম্পানিটি ফর্ম-১৫ পেয়েছে। তবে শিডিউল-এক্স ও ফর্ম-১২-এর অনুমোদন এখনো পাওয়া যায়নি বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে শেয়ার বরাদ্দ সম্পন্ন হয়েছে এবং তা লেনদেনের জন্য উন্মুক্ত করেছে সিডিবিএল।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, একটি তালিকাভুক্ত বীমা কোম্পানির স্থায়ী সম্পদের সঠিক নিবন্ধন না থাকা এবং সম্পদ শনাক্ত করার ব্যবস্থা না থাকা ছোটখাটো হিসাবরক্ষণগত দুর্বলতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ সম্পদের সঠিক রেকর্ড না থাকলে কোম্পানির সম্পদের অস্তিত্ব, অবস্থান, ব্যবহার ও হিসাবের যথার্থতা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এর সঙ্গে ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধনের ঘাটতি এবং স্পন্সর-পরিচালকদের শেয়ার ধারণ নির্ধারিত সীমার নিচে থাকার বিষয়টি যুক্ত হওয়ায় অগ্রণী ইন্স্যুরেন্সের করপোরেট সুশাসন ও নিয়ন্ত্রক পরিপালন নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। ফলে এসব ঘাটতি পূরণে কোম্পানি কী ব্যবস্থা নেয় এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বিনিয়োগকারীদের জন্য।
এসব বিষয়ে জানতে অগ্রণী ইন্স্যুরেন্সের সচিব মো. মফিজুর রহমানের সঙ্গে কয়েক দফা যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।



