ডমিনেজ স্টিল
জালিয়াতি করে আইপিও অর্থে ড্রেজার ক্রয়
- ৫ পরিচালক ও ২ কর্মকর্তাকে ৫ কোটি ১০ লাখ টাকা জরিমানা

প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) অর্থ ব্যবহারে অনিয়ম, তথ্য গোপন ও জালিয়াতির অভিযোগে ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস লিমিটেডের পর্ষদ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ ঘটনায় কোম্পানিটির পাঁচ পরিচালকের প্রত্যেককে ১ কোটি টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া সাবেক দুই কর্মকর্তাকে ৫ লাখ টাকা করে জরিমানা করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। সব মিলিয়ে ডমিনেজ স্টিলের সংশ্লিষ্টদের ওপর আরোপ করা জরিমানার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ১০ লাখ টাকা।
বিএসইসির পরিদর্শন ও তদন্ত প্রতিবেদনে কোম্পানিটির আইপিওর অর্থ ব্যবহারে একাধিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, আইপিও থেকে উত্তোলিত ৩০ কোটি টাকা সুনির্দিষ্ট কিছু খাতে ব্যবহারের কথা ছিল। তবে ওই অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সিকিউরিটিজ আইন ও নির্ধারিত নিয়ম মানা হয়নি। এমনকি আইপিও ফান্ডের ব্যবহার পরিবর্তনের জন্য সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের পূর্বানুমোদন নেওয়ার ক্ষেত্রেও পাওয়া গেছে অনিয়মের অভিযোগ।
এসব অনিয়মের অভিযোগে ডমিনেজ স্টিলের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামসুল ইসলাম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, পরিচালক সুজিত সাহা, পরিচালক রকিবুল ইসলাম এবং পরিচালক আবুল কালাম ভূঁইয়ার প্রত্যেককে ১ কোটি টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। পাশাপাশি কোম্পানিটির সাবেক প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মো. জিল্লুর রহমান এবং সাবেক কোম্পানি সচিব মো. জামির হোসেন চৌধুরীকে ৫ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। আদেশে বলা হয়েছে, অভিযুক্তদের আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ব্যাংক ড্রাফট বা পে-অর্ডারের মাধ্যমে জরিমানার অর্থ জমা দিতে হবে কমিশনে।
তদন্তে উঠে এসেছে, তহবিল ব্যবহারের খাত পরিবর্তনের জন্য বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রকৃত তথ্য গোপন করে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছিল কোম্পানিটি। জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রক্সি ভোট সংগ্রহ করে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। মিথ্যা তথ্য ও জালিয়াতির মাধ্যমে শেয়ারহোল্ডারদের বিভ্রান্ত করার এ বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বিএসইসি।
আইপিওর অর্থ ব্যবহারের অন্যতম অনিয়মটি সংঘটিত হয় ড্রেজার ক্রয়ের ক্ষেত্রে। সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের পূর্বানুমোদন ছাড়াই ১৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘সিএসডি ডমিনেজ-৩’ নামের একটি ড্রেজার কেনা হয়। ২০২১ সালে এই ড্রেজারটি কেনার পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় তিন বছরেও এ সম্পদ থেকে কোনো ব্যবসায়িক আয় হয়নি। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কেনার পর ড্রেজারটি কোনো ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করেনি কোম্পানিটি।
শুধু ক্রয় নয়, ড্রেজারটির প্রস্তুতকারক ও মূল্য নিয়ে কোম্পানির দেওয়া তথ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কোম্পানির নথিপত্রে ড্রেজারটির প্রস্তুতকারক হিসেবে সুন্দরবন শিপবিল্ডার্সের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে প্রতিষ্ঠানটি লিখিতভাবে বিএসইসিকে জানিয়েছে, তারা ওই ড্রেজার তৈরি করেনি। প্রস্তুতকারকের এমন বক্তব্যের পর নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্টক এক্সচেঞ্জে কোম্পানির দেওয়া তথ্যের যথার্থতা নিয়ে তৈরি হয় প্রশ্ন।
তদন্তে সাভারের আশুলিয়া ও নরসিংদীর পলাশে থাকা কোম্পানির দুটি কারখানা দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকার বিষয়টিও উঠে এসেছে। এসব কারখানা বন্ধ থাকার তথ্য বিনিয়োগকারীদের জানানো হয়নি, যা মূল্য সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের বিধানের লঙ্ঘন। অন্যদিকে, আশুলিয়ায় কারখানার শেড সম্প্রসারণের নামে নির্মাণ ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেশি দেখিয়ে আইপিওর অর্থ থেকে প্রায় ৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগও প্রমাণিত হয়েছে বিএসইসির তদন্তে।
ডমিনেজ স্টিল ২০২০ সালে শেয়ারবাজার থেকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে বাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করে। কোম্পানিটি ৩০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে ৩ কোটি শেয়ার ছেড়ে। প্রতিটি শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১০ টাকা। উত্তোলিত অর্থ দিয়ে কোম্পানিটি ভবন নির্মাণ, ইলেকট্রিক্যাল ইনস্টলেশন, প্ল্যান্ট অ্যান্ড মেশিনারিজ ক্রয় ও আইপিও খরচ পরিচালনা করবে বলে জানিয়েছিল। ‘বি’ ক্যাটাগরির এ কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ১০২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। সে হিসাবে কোম্পানিটির মোট শেয়ার সংখ্যা ১০ কোটি ২৬ লাখ। সে হিসাবে ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে কোম্পানিটির উদ্যোক্তা পরিচালকের হাতে ৩০ দশমিক ২০ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ৮ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে দশমিক শূন্য ২ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ৬১ দশমিক ৭০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।



