‘শ্রমিক ফান্ড’ ভাগবাটোয়ারায় পিছিয়ে নেই সিএসই

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দীর্ঘদিন ধরে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) কর্তাদের বিরুদ্ধে শেয়ারহোল্ডারদের ঠকানোর অভিযোগ রয়েছে। মূল ব্যবসায় সাফল্য না পেলেও শেয়ারহোল্ডারদের অর্থের সুদে তারা ভাগবাটোয়ারা নিচ্ছেন। এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জও (সিএসই)। মূল ব্যবসায় বড় লোকসান এবং পরিচালন আয়ে ব্যয় মেটাতে ব্যর্থ হলেও প্রতিষ্ঠানটি এফডিআর, ট্রেজারি বিল ও বন্ড কিনে সুদ থেকে মুনাফা করছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই মুনাফার ৫ শতাংশ আবার অবলীলায় নিচ্ছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অথচ প্রকৃত শেয়ারহোল্ডারদের জন্য মাত্র ৩ দশমিক ৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ সুপারিশ করা হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত সিএসইর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে মিলেছে এসব তথ্য।
এ বিষয়ে সিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সাইফুর রহমান মজুমদার আগামীর সময়কে বললেন, লেনদেন কম হওয়ায় পরিচালন লোকসান হচ্ছে। এটা তো কয়েক বছর ধরে হচ্ছে। তবে ডব্লিউপিপিএফ গঠনে আইনের ব্যত্যয় হয়নি। ব্যাংক-বীমার ক্ষেত্রে হয়তো এই ফান্ড গণনা করার জন্য অনুমোদন পেয়েছে, সে তালিকায় সিএসই নেই।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচ্য বছরে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন আয় ২৪ কোটি ৪৮ লাখের বিপরীতে পরিচালন ব্যয় হয়েছে ৩৯ কোটি ৮ লাখ টাকা। ফলে মূল ব্যবসায় লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৪ কোটি ৬০ লাখ ২ হাজার টাকা। আগের অর্থবছরে পরিচালন লোকসান ছিল ১০ কোটি ৬০ লাখ ৫১ হাজার টাকা। এক বছরের ব্যবধানে সিএসইর লোকসান বেড়েছে প্রায় ৩৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটি ৪০০ কোটি ৩৬ লাখের বিনিয়োগ থেকে নিট সুদ আয় করেছে ৪৯ কোটি ১০ লাখ টাকা। এই সুদের আয় থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ডব্লিউপিপিএফ ফান্ডে ২ কোটি ৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
মূল ব্যবসায় লোকসান হলেও কর্মীদের পেছনে ব্যয় কমেনি। আলোচ্য বছরে মানবসম্পদ খাতে ১৭ কোটি ৪৯ লাখ ১২ হাজার ব্যয় হয়েছে, যা আগের বছর ছিল ১৭ কোটি ৪৭ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। এর মধ্যে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তার পারিশ্রমিক বাবদ ব্যয় যথাক্রমে ১ কোটি ২১ লাখ ৭৬ হাজার ও ৪৫ লাখ ৯১ হাজার টাকা। অন্য কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও চিকিৎসায় ব্যয় ১৫ কোটি ৬০ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। পরিচালকদের সম্মানীতে ব্যয় ২১ লাখ ৮ হাজার টাকা।
বর্তমানে সিএসইর মুনাফার প্রধান উৎস বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত সুদ। আলোচ্য অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির মোট সুদ আয় ৫০ কোটি ১৩ লাখ ৮২ হাজার এবং সুদ ব্যয় ১ কোটি ৪ লাখ ২৪ হাজার টাকা। ফলে নিট সুদ আয় দাঁড়ায় ৪৯ কোটি ৯ লাখ ৫৮ হাজার টাকায়। ট্রেজারি বিল থেকে ২৫ কোটি ১৭ লাখ ৭৩ হাজার, এফডিআর থেকে ১২ কোটি ৭৫ লাখ ৩৪ হাজার, এসটিডি থেকে ৭ কোটি ৬৫ লাখ ৫৮ হাজার এবং জিরো কুপন বন্ড থেকে ৪ কোটি ৫৫ লাখ ১৭ হাজার টাকা আয় হয়েছে।
আর্থিক প্রতিবেদনের আরেক উদ্বেগজনক দিক হলো— মেয়াদোত্তীর্ণ এফডিআর ফেরত না পাওয়া। ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ১২ কোটি, ফিনিক্স ফাইন্যান্সে ১০ কোটি, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সে ৯ কোটি, ইউনিয়ন ক্যাপিটালে ৬ কোটি ৭৬ লাখ ৮৪ হাজার এবং প্রাইম ফাইন্যান্সে ১ কোটি ৭১ লাখ টাকার এফডিআর ছিল। আমানতগুলোর মেয়াদ ২০২০ সালের মধ্যে শেষ হলেও পুরো অর্থ নগদায়ন হয়নি। তিনটি প্রতিষ্ঠান থেকে সামান্য অর্থ উদ্ধার হলেও প্রায় ৩৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা আটকে রয়েছে। এর বিপরীতে অনাদায়ী সুদের পরিমাণ ২ কোটি ৮৫ লাখ ১৭ হাজার টাকা।
পরিচালন আয় কমা, লোকসান বৃদ্ধি এবং সুদনির্ভর মুনাফার মধ্যে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ কমিয়েছে সিএসই। প্রতিষ্ঠানটির পরিশোধিত মূলধন ৬৩৪ কোটি ৫২ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। বছর শেষে রিটেইনড আর্নিংস ৪৭ কোটি ৬৮ লাখ ২৪ হাজারে নেমেছে, যা আগে ছিল ৫২ কোটি ৭৫ লাখ ১৬ হাজার টাকা। নিট মুনাফা হয়েছে ২৮ কোটি ৭৪ লাখ ৩৭ হাজার টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ কম। মুনাফা কমার প্রভাবে শেয়ারপ্রতি মুনাফাও (ইপিএস) ৫০ পয়সা থেকে কমে ৪৫ পয়সায় নেমেছে।



