উৎপাদনে উদ্বৃত্ত সংকটে খামারি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশে রেকর্ড উৎপাদন ও চাহিদার উদ্বৃত্ত থাকার পরও বর্তমানে চরম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের পোলট্রিশিল্প। ফিডের কাঁচামাল ও বাচ্চার অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি, পোলট্রি ওষুধ ও জ্বালানির বাড়তি খরচ, করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজিতে প্রান্তিক খামারিরা মারাত্মক লোকসানের মুখে পড়ছেন, যার ফলে গত কয়েক বছরে প্রায় এক-চতুর্থাংশ খামার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও, জাতীয় স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে ডিম অন্তর্ভুক্তকরণ, মধ্যপ্রাচ্যসহ আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির ব্যাপক সুযোগ এবং প্রক্রিয়াজাত এগ-পাউডার ও তরল ডিমের বাণিজ্যের কারণে এ খাতের সুদূরপ্রসারী সম্ভাবনাও বিশাল। প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের ঋণ সহায়তা ও সঠিক নীতিগত সুরক্ষা দিতে পারলে এটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ নারী কর্মসংস্থানের প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠার প্রবল সম্ভাবনা রাখে।
এ সংকট ও সম্ভাবনার দোলাচলের মধ্যেই আজ শুক্রবার বিশ্ব জুড়ে উদযাপিত হতে যাচ্ছে ৩০তম বিশ্ব ডিম দিবস। বিশ্বব্যাপী পোলট্রিশিল্পের বিপুল অবদান তুলে ধরা, সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আমিষের জোগান নিশ্চিত করা এবং ডিমের স্বাস্থ্যগত গুরুত্ব প্রচার করাই এ দিবসের মূল লক্ষ্য। এ বছর আন্তর্জাতিকভাবে দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘প্রোটিন যা শক্তি জোগায় ও সুরক্ষা দেয়’। সব বয়সের মানুষের মধ্যে পুষ্টি সচেতনতা বাড়াতে ওয়ার্ল্ড এগ অর্গানাইজেশন ‘এগউইন’ নামের একটি বিশেষ বার্ষিকী মাসকটও উন্মোচন করেছে।
বাংলাদেশে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল এবং ওয়ার্ল্ডস পোলট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশনের বাংলাদেশ শাখা যৌথভাবে দিবসটি পালনের ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে। জাতীয়ভাবে এ বছর স্লোগান রাখা হয়েছে— ‘ডিমে পুষ্টি, ডিমে বল, ডিম খেলে বাড়ে রোগ প্রতিরোধ বল’। এ উপলক্ষে দেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেমিনার ও সচেতনতামূলক বর্ণাঢ্য র্যালির পাশাপাশি ঢাকাসহ দেশ জুড়ে পথশিশু, এতিমখানা এবং বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দাদের মধ্যে বিনামূল্যে সিদ্ধ ডিম বিতরণের নানামুখী মানবিক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ডিম উৎপাদনে বর্তমানে স্বয়ংসম্পূর্ণ। দেশে দৈনিক প্রায় পাঁচ কোটি ডিমের চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে সাড়ে ছয় কোটিরও বেশি, যা বছরে দাঁড়ায় প্রায় আড়াই হাজার কোটি ডিমে। এর ফলে বর্তমানে দেশে বার্ষিক জনপ্রতি ডিমের প্রাপ্যতা দাঁড়িয়েছে ১৩৭টি। সরকার এ প্রাপ্যতা ২০৩০ সালের মধ্যে ২০০টিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চীন বছরে সাড়ে ৬১ হাজার কোটি ডিম উৎপাদন করে শীর্ষস্থানে রয়েছে, যেখানে মেক্সিকো ও জাপানে জনপ্রতি ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি। তবে উন্নত বিশ্বের তুলনায় বাংলাদেশের মানুষের খাদ্য তালিকায় ডিমের উপস্থিতি এখনো কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে।
উদ্বৃত্ত উৎপাদন সত্ত্বেও ৫০ হাজারেরও বেশি খামারের প্রায় ৯০ শতাংশ প্রান্তিক উদ্যোক্তারা তীব্র বাজার সিন্ডিকেটের শিকার হচ্ছেন। বর্তমানে খামার পর্যায়ে একটি ডিম তৈরিতে প্রায় ১১ টাকার মতো খরচ হলেও, বিক্রির সময় খামারিদের লোকসান গুনে কম দামে বিক্রি করতে হয়। অথচ তেজগাঁওকেন্দ্রিক পাইকারি বাজার ও হাতবদল হয়ে শহরের খুচরা বাজারে সেই ডিমই সাধারণ ভোক্তাদের কিনতে হচ্ছে ১৩ থেকে ১৫ টাকায়। পোলট্রি খাদ্যের মূল উপাদান ভুট্টার দাম বৃদ্ধি, বার্ড ফ্লুসহ নানা ব্যাধির কারণে উৎপাদনে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। ফলে উৎপাদন খরচ ও বাজারদরের বিশাল ব্যবধান ক্ষুদ্র খামারিদের নিঃস্ব করে দিচ্ছে।
পুষ্টিবিদদের মতে, রেড মিটের চেয়ে ডিম অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব এবং এতে থাকা ফার্স্ট-ক্লাস প্রোটিন, কুসুমের কোলাইন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি শিশু ও অন্তঃসত্ত্বাদের পুষ্টি ঘাটতি মেটাতে দারুণ ভূমিকা রাখে। সম্প্রতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য জাতীয় স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে সপ্তাহে দু-তিনটি করে ডিম দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা অপুষ্টি দূর করার পাশাপাশি প্রান্তিক খামারিদের জন্য একটি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক বাজার তৈরি করবে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ফিডের কাঁচামালে আমদানিশুল্ক ছাড় প্রদান, ‘ফারমার-টু-মার্কেট’ সরাসরি সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সহজ শর্তে ব্যাংকঋণ নিশ্চিত করতে পারলে পোলট্রি খাতের বর্তমান সংকট কাটিয়ে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।



