অ্যাভিয়েশন বাজার ১৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা যাবে
- টিকিট বিক্রি ও আনুষঙ্গিক সেবা বাবদ প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে
- জিডিপিতে বর্তমানে এ খাতের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদান প্রায় ৮ শতাংশ

বিশ্ব জুড়ে যোগাযোগের ধরন বদলে গেছে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের দিকে তাকালে আজ খুব স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়, বিমান ভ্রমণ এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়; বরং এটি একটি অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা। দ্রুত, সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও সহজে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াতের জন্য আধুনিক বিশ্বে বিমান যোগাযোগের কোনো বিকল্প নেই। সড়ক ও রেল যোগাযোগ যেমন আমাদের পরিবহন ব্যবস্থার মৌলিক অংশ, আকাশপথের বিমান চলাচলও ঠিক তেমনি। তাই সড়ক বা রেলের মতো বিমান চলাচলকেও সর্বসাধারণের জন্য সহজলভ্য ও প্রবেশযোগ্য করে তোলা এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশে এই খাতের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বিশাল। বর্তমানে আমাদের অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচল বাজারের আকার প্রায় ৫-৬ বিলিয়ন ডলার। তবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হলে দেশের এই অ্যাভিয়েশন বাজারকে সহজেই ১৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব। এর মাধ্যমে বাৎসরিক ২০-২৪ মিলিয়ন যাত্রী এবং অন্তত ৫ লাখ টন কার্গো পরিবহনের বিশাল সক্ষমতা অর্জন করবে বাংলাদেশ। ভবিষ্যতে দেশের কাঙ্ক্ষিত ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার দৌড়ে এই অ্যাভিয়েশন খাত অত্যন্ত কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতির কাঠামোয় বিশ্বমানের অ্যাভিয়েশন খাতের গুরুত্ব অপরিসীম। বৈশ্বিক অ্যাভিয়েশন সেবার বাজারের আকার যেখানে প্রায় ৫ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার, সেখানে বাংলাদেশের অংশ মাত্র ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, দেশের বর্তমান অ্যাভিয়েশন বাজারের মাত্র ২২ শতাংশ দেশীয় এয়ারলাইনসগুলোর নিয়ন্ত্রণে, আর বাকি ৭৭ শতাংশের বেশি আন্তর্জাতিক ও বিদেশি এয়ারলাইনসের দখলে। ফলে টিকিট বিক্রি ও আনুষঙ্গিক সেবা বাবদ প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে।
অথচ আমাদের দেশের অ্যাভিয়েশন খাতের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার। জাতীয় জিডিপিতে বর্তমানে এ খাতের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদান প্রায় ৮ শতাংশ। এই সম্পদ ও সুযোগ থেকে আমরা কতটা প্রবৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারছি, তা গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে। আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত— বিপুল সম্ভাবনাময় এ খাতকে আরও বড় পরিসরে কাজে লাগানো।
ভৌগোলিক দিক থেকেও বাংলাদেশ অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। আমাদের আশপাশের আঞ্চলিক আকাশপথ দিয়ে প্রতি বছর প্রায় ৮ কোটি ৩০ লাখ যাত্রী যাতায়াত করেন। বিশেষ করে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলো থেকে প্রতি বছর প্রায় ৪ কোটি ৪০ লাখ যাত্রী এশিয়ার বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করছেন। কৌশলগত সংযোগস্থল হিসেবে বাংলাদেশ চাইলেই এই বিশাল যাত্রীগোষ্ঠীকে আকর্ষণ করতে পারে। আমাদের বিমানবন্দরগুলো ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে যাত্রীদের মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া কিংবা অন্যান্য পূর্ব এশীয় গন্তব্যে যাতায়াতের সুব্যবস্থা করা সম্ভব।
তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন বিশ্বমানের অবকাঠামো ও নির্বিঘ্ন সেবা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের আগামী ১৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। এই কর্মপরিকল্পনা সফলভাবে অনুসরণের জন্য অবিলম্বে একটি শক্তিশালী ‘কৌশলগত কমিটি’ ও ‘স্টিয়ারিং কমিটি’ গঠন করা প্রয়োজন। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে পারলে বাংলাদেশের অ্যাভিয়েশন খাত শুধু একটি পরিবহন সেবা হিসেবেই থাকবে না, বরং জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে।
বেসরকারি এয়ারলাইনস ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং খাতের প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান হিসেবে টোটাল এয়ার সার্ভিসেস লিমিটেড শুরু থেকেই দেশীয় অ্যাভিয়েশনের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে। দেশের আকাশপথের এই অপার সম্ভাবনাকে উন্মোচিত করতে সরকারি কাঠামোর পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগের সুসমন্বিত বিকাশ এখন সময়ের দাবি। বিশ্বমানের অ্যাভিয়েশন ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে যৌথ বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শাহজালাল বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনালকেন্দ্রিক এই বাণিজ্যিক রূপান্তর সফল হলে শুধু এয়ারলাইনস খাতই নয়, বরং লজিস্টিকস, পর্যটন ও কর্মসংস্থানে এক অভূতপূর্ব গতি সঞ্চার হবে। এই আঞ্চলিক হাব গড়ে তোলার যৌথ যাত্রায় বেসরকারি খাত পূর্ণ অংশীদার হতে প্রস্তুত।
লেখক: চেয়ারম্যান, টোটাল এয়ার সার্ভিসেস লিমিটেড



