সম্পদ বেচে বীমা দাবি মেটানোর ছক
- তালিকায় ৭ কোম্পানি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের বীমা খাতে গ্রাহকদের আটকে থাকা হাজার হাজার কোটি টাকার দাবি মেটাতে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। সংকটে থাকা কোম্পানিগুলোর জমি, ভবন ও বিনিয়োগের মতো স্থায়ী সম্পদ বিক্রি করে গ্রাহকের টাকা পরিশোধের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এ পরিকল্পনার বাস্তবায়নে আইনি ও বাস্তব নানা জটিলতা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
বীমা খাতের এ উদ্ধার পরিকল্পনার সূত্রপাত মূলত গত বছর থেকে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, লাইফ ও নন-লাইফ মিলে বীমা খাতে বর্তমানে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার দাবি বকেয়া রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র সাতটি কোম্পানির কাছেই আটকে আছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। আইডিআরএ প্রাথমিকভাবে এই সাতটি কোম্পানিকেই উদ্ধারের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
আইডিআরএ চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন বলেছেন, ‘বীমা খাতে এখন সবচেয়ে বড় সংকট হলো গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনা। এজন্য প্রথম কাজ হচ্ছে যত দ্রুত সম্ভব বকেয়া দাবি পরিশোধ শুরু করা।’
তিনি জানালেন, সম্প্রতি সবচেয়ে সংকটাপন্ন সাতটি বীমা কোম্পানির মালিকপক্ষ ও প্রধান নির্বাহীদের (সিইও) সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছে আইডিআরএ। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্পদ, বিনিয়োগ ও আর্থিক সক্ষমতা বিশদ পর্যালোচনা করা হয়েছে।
চেয়ারম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, কোম্পানিগুলোর স্থায়ী সম্পদ নগদায়নের ক্ষেত্রে মূলত চারটি উৎস বিবেচনা করা হচ্ছে— ভালো ব্যাংকে থাকা এফডিআর, সরকারি ট্রেজারি বন্ড, বিক্রয়যোগ্য জমি এবং অন্যান্য বিনিয়োগ। আর ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে আটকে থাকা আমানতের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করা হবে। প্রতিটি কোম্পানির জন্য অডিটরযুক্ত পৃথক ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ‘আগে এলে আগে পাবেন’ (এফআইএফও) পদ্ধতিতে গ্রাহকের পাওনা পরিশোধ করা হবে।
তবে কাগজে-কলমে এ উদ্যোগটি যতটা আশাব্যঞ্জক, বাস্তবে স্থায়ী সম্পদ বিক্রি করে দ্রুত অর্থ আদায় করা ততটাই জটিল। প্রথম সংকটটি হলো সম্পদের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ নিয়ে। অতীতে সংকটে পড়া অনেক কোম্পানি তাদের কেনা জমি বা ভবনের দাম নথিপত্র ও ব্যালান্স শিটে কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেখিয়েছে (ওভার ভ্যালুয়েশন)। এখন বাজারে সেসব সম্পদ বিক্রি করতে গেলে নথির সেই চড়া দামের সঙ্গে বাস্তব বাজারের মূল্যের বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে, ফলে উপযুক্ত ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না।
এ বাস্তব সংকট নিয়ে জেনিথ লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসির সিইও এস এম নুরুজ্জামান আগামীর সময়কে বললেন, ‘গ্রাহক তার জমানো টাকা না পেয়ে পথে পথে ঘুরছে আর কোম্পানি তার স্থায়ী সম্পদ নিয়ে বসে আছে। কিন্তু এর আগে উদ্যোগ নিলেও সম্পদ বিক্রি করা যাচ্ছিল না। বড় কারণ হলো সম্পদগুলো পারস্পরিক যোগসাজশের মাধ্যমে বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে কেনা হয়েছিল।’
তবে দাম কম পাওয়ার অজুহাতে বসে থাকার সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি আরও বললেন, ‘গ্রাহকের দাবি পরিশোধের জন্য বর্তমান বাজারদরেই সম্পদ বিক্রি করতে হবে। এতে অন্তত আংশিক দাবি পরিশোধ করা যাবে। আর আগের কোম্পানির কুশীলবদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।’
বিদ্যমান বীমা আইন-২০১০ অনুযায়ী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা সরাসরি কোনো কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করতে পারে না। লিকুইডেটর নিয়োগ সময়সাপেক্ষ এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালীরা আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে আসেন। আইনি এই দীর্ঘসূত্রতা কাটাতে ‘বীমাকারীর রেজল্যুশন অধ্যাদেশ’ নামে একটি নতুন খসড়া আইন অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে আইডিআরএ। আইনটি পাস হলে সংস্থাটি দুর্বল কোম্পানিকে একীভূত করা বা বোর্ডের মালিকানা কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা পাবে। প্রয়োজনে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেও অর্থ আদায় করা যাবে।
এ আইনি দীর্ঘসূত্রতা থেকে বের হতে আইডিআরএ বর্তমানে ‘বীমাকারীর রেজল্যুশন অধ্যাদেশ’ নামে একটি নতুন খসড়া আইন তৈরি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠিয়েছে। এই প্রস্তাবিত অধ্যাদেশটি পাস হলে আইডিআরএ কোনো দুর্বল বীমা কোম্পানিকে জোরপূর্বক অন্য ভালো কোম্পানির সঙ্গে একীভূত করা কিংবা বোর্ডের মালিকানা কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা পাবে। কোম্পানির প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদ বিক্রি করেও যদি গ্রাহকের পাওনা শোধ না হয়, তবে এই আইনের অধীনে উদ্যোক্তা এবং পরিচালকদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ক্রোক ও বিক্রি করে অর্থ উদ্ধার করা যাবে।
তবে এই পুরো প্রক্রিয়ার কাঠামোগত ত্রুটি ও বাস্তবায়ন জটিলতা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মাইনউদ্দিন আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘স্বাভাবিকভাবে বাজারে যখন এটি প্রচার হবে যে কোনো কোম্পানির স্থায়ী সম্পদ জোর করে বিক্রি করা হচ্ছে, তখন সাধারণ ক্রেতারা তা কিনতে চাইবে না বা যথাযথ মূল্য পাওয়া যাবে না।’
এ সংকট কাটানোর উপায় হিসেবে তার পরামর্শ, ‘সরকার চাইলে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে এসব সম্পদ বিক্রি করতে পারে, যা পরে রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহার করা যাবে। এটা না করলে বাস্তবায়ন করা কঠিন।’
অর্থনীতিবিদ ও বীমা খাত বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শুধু সম্পদ বিক্রির ঘোষণা বা চিঠি চালাচালি করলেই সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। যে সম্পদগুলো বিক্রয়যোগ্য, সেগুলোর প্রকৃত বাজারমূল্য যাচাইয়ের জন্য একটি নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক অডিট ফার্ম দিয়ে জরুরি মূল্যায়ন করা দরকার। একই সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়কে আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি কাটিয়ে দ্রুত প্রস্তাবিত রেজল্যুশন অধ্যাদেশটি অনুমোদন করে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে পূর্ণ আইনি সুরক্ষা দিতে হবে।




