অর্থমন্ত্রীর ডাকে সাড়া নেই ব্যবসায়ীদের

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বকেয়া রাজস্ব আদায়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর উদ্যোগে আশানুরূপ সাড়া দিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। বকেয়া কর পরিশোধে ছাড়, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) পদ্ধতিতে মামলা নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত তেমন অগ্রগতি হয়নি। কর্মকর্তাদের ছাড় দেওয়ার অনীহা, আইনি জটিলতা, ব্যবসায়ীদের কর পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা এবং দুর্বল ব্যবসায়িক পরিস্থিতিকে এর জন্য দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন আদালতে মামলা চলায় ৮২ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকার রাজস্ব আটকে আছে। এর মধ্যে আয়কর খাতে ৩৬ হাজার ৭০০ কোটি, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) খাতে ৩৬ হাজার ২০০ এবং শুল্ক খাতে ৯ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই বকেয়া রাজস্ব আদায়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে এডিআরের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করে রাজস্ব আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত বাজেটে এ-সংক্রান্ত আইনেও সংশোধন আনা হয়। তবে অর্থবছরের তিন মাস পার হলেও প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যায়নি।
এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, সংস্থাটির তিনটি বিভাগ থেকে প্রায় ৫০টি প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পাওনা। তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মালিকদের সঙ্গে বৈঠকের উদ্যোগ নেন অর্থমন্ত্রী। তবে এখন পর্যন্ত শুধু মোবাইল ফোন অপারেটরদের মালিকপক্ষের প্রতিনিধিরা বৈঠকে অংশ নিয়েছেন।
এনবিআরের সাবেক সদস্য (করনীতি) সৈয়দ আমিনুল করিম আগামীর সময়কে বলেছেন, এডিআরের মাধ্যমে বকেয়া কর আদায় করতে হলে রাজস্ব কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী— দুপক্ষকেই ছাড় দিতে হয়। কিন্তু ছাড় দেওয়ার মানসিকতার অভাব রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা ছাড় দিলে হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে তারা ঝুঁকি নিতে চান না। এ ছাড়া আইনি জটিলতাও রয়েছে, যেগুলো সংস্কার করা প্রয়োজন।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, আয়কর-সংক্রান্ত ৫ হাজার ৫০০টি মামলায় আটকে আছে ৩৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৬টি বড় কর মামলায় জড়িত রাজস্ব প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। এসব মামলার তালিকা অর্থমন্ত্রীর কাছে দেওয়া হয়েছে।
ভ্যাট-সংক্রান্ত ১১ হাজার ৬৮৪টি মামলায় আটকে আছে ৩৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে উচ্চ আদালতে চলমান মামলাগুলোতেই জড়িত রাজস্ব ২৮ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। অন্যদিকে, শুল্ক-সংক্রান্ত ১২ হাজার ৩৩৫টি মামলায় আটকে আছে ৯ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা।
বকেয়া রাজস্ব আদায়ে ব্যবসায়ীদের সক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আগামীর সময়কে বলেছেন, ব্যবসায়ীরা সাধারণত টাকা আটকে রাখতে চান। সুযোগ দেওয়া হলেও তারা তা মানছেন না। তবে দেশের বর্তমান ব্যবসায়িক পরিস্থিতিও ভালো নয়। অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা টিকিয়ে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছে। তিনি বলেছেন, ব্যবসায়িক পরিস্থিতির কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানই আর্থিক সংকটে রয়েছে। ফলে বকেয়া রাজস্ব পরিশোধের ক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। গত অর্থবছরে আদায় হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে আদালতে আটকে থাকা রাজস্ব চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১৪ শতাংশ এবং গত অর্থবছরের আদায়ের প্রায় ২০ শতাংশের সমান।
বকেয়া রাজস্ব আদায়ে মাসভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বড় অঙ্কের রাজস্ব-জড়িত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে অর্থ জমা করাই এর লক্ষ্য। তবে এজন্য আইনি জটিলতা দূর করার পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও রাজস্ব কর্মকর্তাদের মধ্যে সমঝোতার সুযোগ তৈরি করা জরুরি বলে মনে করছেন এনবিআর কর্মকর্তারা।



