সাক্ষাৎকার
দামের লাগাম টানতে খামারিদের উৎপাদন ব্যয় কমাতে হবে

মো. সাফির রহমান
ডিমের দাম কমাতে হলে প্রথমেই খামারিদের উৎপাদন ব্যয় কমাতে হবে। কারণ, খামারিদের মোট উৎপাদন ব্যয়ের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই যায় ফিডের পেছনে। আগামীর সময়কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) মহাসচিব মো. সাফির রহমান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি মো. আহসানুজ্জামান
প্রশ্ন: দেশে ডিমের উৎপাদন ও চাহিদার পরিস্থিতি কেমন?
মো. সাফির রহমান: প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে প্রায় ২ হাজার ৪৪০ কোটি ডিম উৎপাদন হয়েছে। দৈনিক উৎপাদন ছয় কোটির বেশি। অথচ ২০১০-১১ অর্থবছরে সারা বছরে উৎপাদন ছিল প্রায় ৬০০ কোটি। অর্থাৎ দেড় দশকে উৎপাদন অনেক বেড়েছে। মানুষের প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে সামনে আরও সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
প্রশ্ন: ভোক্তাদের কাছে ডিমের দাম বেশি হওয়ার মূল কারণ কী?
মো. সাফির রহমান: এখানে খামারির ন্যায্যমূল্য ও ভোক্তাপর্যায়ের দাম— দুটি বিষয় দেখতে হবে। খামার থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে ডিম দু-তিনবার হাতবদল হয়। ফলে খামারি যে দামে বিক্রি করেন, ভোক্তাকে এর চেয়ে অনেক বেশি দামে কিনতে হয়। অথচ দিনের শেষে খামারিও সবসময় ন্যায্যমূল্য পান না। মধ্যস্বত্বভোগী, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে মার্জিন যুক্ত হয়।
প্রশ্ন: খামারিদের উৎপাদন খরচ কত?
মো. সাফির রহমান: বর্তমানে প্রতি ডিম উৎপাদনে খরচ প্রায় ৯ টাকার কিছু বেশি। ফিডের দামসহ অন্যান্য ব্যয় বেড়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে দীর্ঘ সময় খামারিরা উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে ডিম বিক্রি করেছেন। গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের মে-জুন পর্যন্ত অনেক খামারি লোকসানে ছিলেন। ফলে অনেকে নতুন করে উৎপাদনে আসছেন না। এতে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে।
প্রশ্ন: ডিমের দাম কমাতে কী করা প্রয়োজন?
মো. সাফির রহমান: প্রথমেই উৎপাদন খরচ কমাতে হবে। মোট খরচের ৭০-৮০ শতাংশ ফিডে যায়। তাই ফিডের কাঁচামালের দাম ও মাননিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ডিওসির মান, খামার ব্যবস্থাপনা ও বায়োসিকিউরিটিও নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশ্ন: ফিডের মান নিয়ে কী ধরনের সমস্যা রয়েছে?
মো. সাফির রহমান: ফিডে প্রয়োজনীয় ও মানসম্মত কাঁচামাল ব্যবহার হচ্ছে কি না— তা নিশ্চিত করতে হবে। কিছু ক্ষেত্রে অবৈধ কাঁচামাল, অ্যান্টিবায়োটিক বা গ্রোথ প্রমোটর ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এতে স্বল্প মেয়াদে খরচ কমলেও ভোক্তার স্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সরকারি সংস্থাগুলোর কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
প্রশ্ন: ফিডের দাম কমাতে সরকারের করণীয় কী?
মো. সাফির রহমান: ফিডের গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। এসবের ওপর এআইটি, অ্যাডভান্স ট্যাক্স, অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্সসহ বিভিন্ন শুল্ককর রয়েছে। প্রতিবেশী অনেক দেশে কৃষি ও এগ্রোশিল্পের কাঁচামালে এমন করের বোঝা নেই। তাই পোলট্রিশিল্পকে সাধারণ রাজস্ব খাত হিসেবে না দেখে খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কাঁচামালের শুল্ককর সর্বনিম্ন, সম্ভব হলে শূন্যপর্যায়ে আনার উদ্যোগ প্রয়োজন।
প্রশ্ন: খামারিরা দীর্ঘদিন লোকসানে থাকলে কী হতে পারে?
মো. সাফির রহমান: লোকসানের কারণে অনেক খামারি এরই মধ্যে উৎপাদন থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন। স্বল্প সুদের ঋণ পাওয়ার সুযোগও সীমিত। এভাবে উৎপাদন কমতে থাকলে একসময় বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হবে। তখন শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকেই বেশি দামে ডিম কিনতে হবে।
প্রশ্ন: ডিম দিবসে সরকারের প্রতি আপনাদের বার্তা কী?
মো. সাফির রহমান: খামারিদের সমস্যাগুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। কর ও শুল্কনীতি সহনীয় করতে হবে। শুধু কত রাজস্ব আদায় হবে, তা না দেখে কীভাবে শিল্পটিকে সহযোগিতা করা যায়, সেটি ভাবতে হবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার। এতে কম খরচে উন্নতমানের ফিড ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের পথ তৈরি হবে।
প্রশ্ন: ডিম দিবসে খামারিদের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?
মো. সাফির রহমান: বাংলাদেশের সব লেয়ার খামারিকে আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই। তারা নিজেদের নানা সংকট ও পরিশ্রমের মধ্যেও দেশের মানুষের প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করছেন। একই সঙ্গে খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।



