সাক্ষাৎকার
সম্পর্ক শুধু শ্রমবাজারে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না

এম সামসুল আলম লিটন, সদস্য, এসএবিসিসিআই
সৌদি আরব ও বাংলাদেশের সম্পর্ককে শুধু জনশক্তি ও রেমিট্যান্সের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পণ্য রপ্তানি, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা ও কৃষিসহ নতুন খাতে সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। সৌদির অর্থনীতি আধুনিক করার উদ্যোগে বাংলাদেশেরও অংশীদার হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সৌদি আরবের জাতীয় দিবস উপলক্ষে এসব বিষয় নিয়ে আগামীর সময়ের সঙ্গে কথা বলেছেন সৌদি আরব-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এসএবিসিসিআই) পরিচালক এবং অতীশ দীপঙ্কর ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান এম শামসুল আলম লিটন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি নুরুজ্জামান তানিম
প্রশ্ন: সৌদি আরবের জাতীয় দিবস বাংলাদেশের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
সামসুল আলম লিটন: সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ব্রিটিশ ভারত, পাকিস্তান আমল এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে আত্মিক ও পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক রয়েছে। সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, পুরো মুসলিমবিশ্বের জন্যও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় দিবসে সৌদি আরবের জনগণ ও সরকারের প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা, শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই।
প্রশ্ন: এ সম্পর্ককে অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ কোথায়?
সামসুল আলম: সৌদি আরবের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এতদিন দেশটিকে মূলত শ্রমবাজার হিসেবে দেখেছি। কিন্তু এখন পণ্য রপ্তানি, তথ্যপ্রযুক্তি ও সেবা খাতে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। গত এক দশকে সৌদি আরব তাদের অর্থনীতিকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে এগিয়ে যাচ্ছে। পরিবর্তনের এ সময়ে নতুন অর্থনৈতিক সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য দেশটিতে প্রবেশের সুযোগটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন: সৌদি আরবে অবস্থানরত বিশাল বাংলাদেশি জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে রেমিট্যান্স বাড়ানোর উপায় কী?
সামসুল আলম: সৌদি আরবে প্রায় সাড়ে ৩৫ লাখ বাংলাদেশি রয়েছেন, যা আমাদের বড় শক্তি। তবে সম্পর্ক শুধু জনশক্তি রপ্তানিতে সীমাবদ্ধ না রেখে তাদের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। অন্তত অর্ধেক বাংলাদেশিকে আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলতে পারলে তাদের আয় কয়েকগুণ বাড়বে। ফলে দেশের রেমিট্যান্সও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।
প্রশ্ন: দক্ষ জনশক্তির কোন খাতে বেশি সুযোগ রয়েছে?
সামসুল আলম: শিক্ষা ও চিকিৎসায়, বিশেষ করে ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য সৌদি আরবে বড় সুযোগ রয়েছে। সৌদি মেডিকেল কাউন্সিলসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে বাংলাদেশি দক্ষ জনশক্তির নতুন সুযোগ তৈরি সম্ভব। এ ছাড়া, সৌদি অর্থনীতি দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ায় তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও আমাদের প্রস্তুত হতে হবে; এতে দক্ষ বাংলাদেশিদের কাজের সুযোগ আরও বাড়বে।
প্রশ্ন: কৃষি খাতে দুই দেশের সহযোগিতার সম্ভাবনা কীভাবে দেখছেন?
সামসুল আলম: কৃষিতে বাংলাদেশের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সৌদি আরবের খাদ্যনিরাপত্তায় কাজে লাগানোর বড় সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের দক্ষতা দিয়ে সৌদির কৃষি উন্নয়নে সহযোগিতা করা যেতে পারে। এজন্য সরকারি পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো প্রয়োজন, যেখানে বেসরকারি খাতও সমানভাবে আগ্রহী। তাই কৃষিকে দুই দেশের সহযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
প্রশ্ন: সৌদি আরবের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলাদেশ কীভাবে যুক্ত হতে পারে?
সামসুল আলম: সৌদি আরব অর্থনীতি ঢেলে সাজিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার অর্থনৈতিক কেন্দ্র হতে চাইছে। এ পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলাদেশেরও যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে শুধু বেসরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, সরকারি পর্যায় থেকেও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও জনশক্তিসহ সব খাতকে সমান গুরুত্ব দিয়ে সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
প্রশ্ন: এসএবিসিসিআইয়ের ভূমিকা কী হতে পারে?
সামসুল আলম: সৌদি-বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করতে এসএবিসিসিআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আমার আশা, চেম্বারটি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক বাণিজ্যনির্ভর চেম্বারে পরিণত হবে। দুই দেশের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি, নতুন ব্যবসার সুযোগ খোঁজা এবং বাংলাদেশি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে চেম্বার কাজ করতে পারে।
প্রশ্ন: সৌদি আরবকে নিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য কী হওয়া উচিত?
সামসুল আলম: শুধু রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্পর্ক তৈরি সম্ভব নয়; লক্ষ্য হওয়া উচিত সৌদি আরবের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অংশীদার হওয়া। পণ্য রপ্তানি, দক্ষ জনশক্তি, শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিনিয়োগ— সব খাতেই সম্পর্ক বাড়াতে হবে। সৌদির অর্থনীতির এ দ্রুত পরিবর্তনের সময়ে বাংলাদেশ পরিকল্পিতভাবে এগোলে, তা দুই দেশের জন্যই দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবে।



