দুর্নীতি বন্ধ করে জনগণকে সঠিক সেবা দেওয়া উচিত
- সরকারি চাকরিজীবীদের পে স্কেল

এম কে মুজেরী
সরকারি চাকরিজীবীদের ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি সামষ্টিক অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বহুমুখী প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে। এই বেতন বৃদ্ধির ফলে বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ, বেসরকারি খাতের কর্মীদের প্রত্যাশা এবং বাজেটে অর্থায়নের ঘাটতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সমসাময়িক এসব বিষয় নিয়ে আগামীর সময়ের সঙ্গে কথা বলেছেন অর্থনীতিবিদ এম কে মুজেরী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিজনেস এডিটর মিজান চৌধুরী
প্রশ্ন: দীর্ঘদিন পর জারি করা নবম পে স্কেল কি অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বা বাজেটে ঘাটতি তৈরি করবে?
এম কে মুজেরী: ২০১৫ সালের পর দীর্ঘ সময় পার হওয়ায় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে জীবনমান সমন্বয় করতে নতুন কাঠামো আসলেই প্রয়োজন ছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকার তার মেয়াদের শেষ মুহূর্তে এটি গ্রহণ করে; কিন্তু বাস্তবায়ন করে যেতে পারেনি। ফলে নতুন সরকারের ঘাড়ে এর বাস্তবায়নের দায়ভার অসময়ে এসে পড়ে। সরকার নতুন কমিশন গঠন করে এক বছর সময় নিয়ে এটি বাস্তবায়ন করলে সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠা অনেক সহজ হতো।
প্রশ্ন: বেতন বৃদ্ধির কারণে বাজারে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষ, যারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, তারা কীভাবে মোকাবিলা করবে?
এম কে মুজেরী: দেশে প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কয়েক কোটি মানুষ কাজ করেন। তাদের তুলনায় সরকারি কর্মকর্তা ও পেনশনভোগীদের সংখ্যা মাত্র ১৯-২০ লাখ, যা কর্মক্ষম জনশক্তির অতি ক্ষুদ্র অংশ। স্বাভাবিক নিয়মে ক্ষুদ্র অংশের বেতন বাড়লে বাজারে বড় প্রভাব পড়ার কথা নয়। কিন্তু আমাদের বাজার ব্যবস্থায় এটি মানসিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে এবং ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিয়ে সব পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন। ফলে সাধারণ মানুষ, যারা এমনিতেই জীবন বাঁচাতে সংগ্রাম করছেন, তারা মূল্যস্ফীতির চরম শিকার হবেন, যা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় সংকট।
প্রশ্ন: সরকারের এই বিপুল বেতন বৃদ্ধি কি বেসরকারি খাতের বিশাল কর্মী বাহিনীর ওপর কোনো বিরূপ প্রভাব ফেলবে?
এম কে মুজেরী: অবশ্যই এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। যেহেতু একই সমাজে সবাই বসবাস করছে, তাই একটি অংশের বেতন বাড়লে বেসরকারি খাতের কর্মীদের মধ্যেও বেতন বৃদ্ধির প্রত্যাশা জাগা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। তবে এই প্রত্যাশা মেটানোর সক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব আর্থিক অবস্থার ওপর নির্ভর করবে।
প্রশ্ন: মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী বেতন বাড়লে কি সরকারি সেবার মান বাড়বে এবং দীর্ঘদিনের দুর্নীতি কমে আসবে?
এম কে মুজেরী: অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, শুধু বেতন কাঠামোর পরিবর্তন হলেই সেবার মান বাড়ে না বা দুর্নীতি কমে না। ডিজিটাইজেশনের কথা বলা হলেও ভূমি বা পাসপোর্ট অফিসে দুর্নীতি কমেনি। এটি মূলত একটি নৈতিকতার প্রশ্ন। সাধারণ মানুষ যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে জীবন বাঁচাতে পরাজিত হওয়ার মতো যুদ্ধ করছে, তখন সরকারি কর্মচারীরা সুবিধাভোগী শ্রেণি হিসেবে বিশেষ সুরক্ষা পেয়েছেন। নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের উচিত দুর্নীতি পরিহার করে জনগণকে সঠিক সেবা দেওয়া।
প্রশ্ন: সরকারি চাকরিতে সুবিধা বাড়লে বেসরকারি খাতে কি মেধাশূন্যতা তৈরি হওয়ার কোনো আশঙ্কা আছে?
এম কে মুজেরী: আমাদের মানবসম্পদের অভাব নেই, বরং আমরা এখন একটি ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনসংখ্যাগত বোনাসকাল পার করছি, যা আগামী ১০-১৫ বছর সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকবে। আমরা যদি কর্মক্ষম জনশক্তিকে মানসম্মত শিক্ষা ও সঠিক প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তুলতে পারি, তবে সরকারি ও বেসরকারি কোনো খাতেই মেধার ঘাটতি থাকবে না, যা সামগ্রিক অগ্রযাত্রার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
প্রশ্ন: অতিরিক্ত অর্থায়ন মেটাতে গিয়ে সরকারের চলমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে কি কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হবে?
এম কে মুজেরী: জিডিপির অনুপাতে আমাদের রাজস্ব আদায়ের হার মাত্র ৭ শতাংশের কাছাকাছি, যা বিশ্বে সর্বনিম্নগুলোর মধ্যে একটি। যেহেতু কর্মচারীদের বেতন দেওয়া বাধ্যতামূলক এবং এই খরচ কমানোর সুযোগ নেই, তাই লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করতে না পারলে অন্যান্য উন্নয়ন ব্যয় কমাতে হবে। ঘাটতি মেটাতে সরকারকে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর অনেক বেশি নির্ভর করতে হবে। সরকার দেশীয় ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাবে, যা সামগ্রিক উন্নয়নকে ব্যাপকভাবে ব্যাহত করবে। রাজস্ব আদায় বাড়ানো ছাড়া এই গোলকধাঁধা থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় নেই।



