নন-কটন পোশাক
রপ্তানি বাড়লেও সক্ষমতায় ঘাটতি
- এক দশকে রপ্তানি বেড়েছে ১৯.৪%

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিশ্ববাজারে কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক বা নন-কটন পোশাকের চাহিদা বাড়ছে। স্পোর্টসওয়্যার, অ্যাকটিভওয়্যার ও কারিগরি ব্যবহারের পোশাকে এ ধরনের তন্তুর ব্যবহার বেশি। তবে বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারেনি বাংলাদেশ। ফলে গত এক দশকে দেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নন-কটন পণ্যের অংশ বাড়লেও উচ্চমূল্যের এই বাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে দেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ম্যানমেইড ফাইবার বা কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাকের অংশ ছিল ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৭ শতাংশে। অর্থাৎ এক দশকে রপ্তানিতে এ ধরনের পোশাকের অংশ বেড়েছে ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ।
আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাক তৈরিতে নন-কটন ফাইবারের ব্যবহার প্রায় ৭৫ শতাংশ। বিপরীতে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রায় ৬৯ দশমিক ৭ শতাংশ এখনো তুলাভিত্তিক। এ চিত্র বলছে, নন-কটন পোশাকের রপ্তানিতে অগ্রগতি হলেও বৈশ্বিক বাজারের চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নন-কটন পোশাক উৎপাদনের অবকাঠামো ও পশ্চাৎমুখী সংযোগ শিল্পে ১৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা গেলে ২০৩২ সালের মধ্যে এ ধরনের পোশাক রপ্তানি ৪২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব। তবে এ লক্ষ্য অর্জনে আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, নতুন পণ্য উদ্ভাবন এবং সিনথেটিক তন্তু প্রক্রিয়াজাতকরণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান আগামীর সময়কে বলেছেন, নন-কটনভিত্তিক পোশাক উৎপাদনে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে, তবে তা এখনো পর্যাপ্ত নয়। দেশের অধিকাংশ পোশাক কারখানা তুলাভিত্তিক পোশাক উৎপাদনে অভ্যস্ত। এ খাতের পশ্চাৎমুখী সংযোগ শিল্পও মূলত তুলানির্ভর পণ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।
ইনামুল হক খান বলেছেন, ‘বিশ্ববাজারে নন-কটন পোশাকের চাহিদা বিবেচনায় বাংলাদেশেরও এ ধরনের পোশাক উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে কিছু বিনিয়োগ আসতে শুরু করেছে, যা ইতিবাচক।’
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে দেশে মোট তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে ২ হাজার ৯৯১ কোটি ডলারের। এর মধ্যে ম্যানমেইড ফাইবারভিত্তিক পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৯১৭ কোটি ডলারের। মোট পোশাক রপ্তানিতে এ ধরনের পণ্যের অংশ ছিল ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ।
মাসভিত্তিক হিসাবেও নন-কটন পোশাকের রপ্তানি অংশে ওঠানামা দেখা গেছে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে মোট পোশাক রপ্তানিতে এ ধরনের পণ্যের অংশ ছিল ২৮ শতাংশ। জুনে তা বেড়ে ৩১ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছায়। আগস্টে সর্বোচ্চ ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশে ওঠার পর সেপ্টেম্বরে কমে দাঁড়ায় ৩২ দশমিক ৬ শতাংশে।
তবে তুলাভিত্তিক পোশাক এখনো বাংলাদেশের রপ্তানির মূল ভিত্তি। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতি মাসে এ ধরনের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৯৭ কোটি থেকে ২৬০ কোটি ডলারের মধ্যে। তাই নন-কটন পোশাকের অংশ বাড়লেও তুলার তৈরি পোশাকের গুরুত্ব কমেনি।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেছেন, ‘কটন বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের অন্যতম শক্তি। অদূর ভবিষ্যতে এ শক্তি হারিয়ে যাবে না। তবে নন-কটন পণ্যে প্রকৃত উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলে বাংলাদেশকে শুধু বেশি পণ্য উৎপাদনের প্রতিযোগিতা থেকে মূল্য সংযোজনের প্রতিযোগিতায় যেতে হবে।’
মহিউদ্দিন রুবেল নন-কটন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি সিনথেটিক ও কারিগরি তন্তু প্রক্রিয়াজাতকরণ, রঙ করা এবং ফিনিশিংয়ের সক্ষমতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেন। তার মতে, এ খাতে দক্ষ কারিগরি জনবল তৈরি এবং নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি।
বিশ্ববাজারে উচ্চমূল্যের পোশাকের চাহিদা বাড়ার এ সময়ে নন-কটন পণ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কাঁচামাল থেকে শুরু করে পোশাক উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে পারলে এ খাত রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ এবং পণ্যের মূল্য সংযোজন— দুই ক্ষেত্রেই বড় ভূমিকা রাখতে পারে।



