সাক্ষাৎকার
উচ্চ সুদে টিকতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা

আবু আহমেদ
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের সংকট ও উন্নয়ন কৌশল নিয়ে দৈনিক আগামীর সময়ের মুখোমুখি হয়েছেন দেশের প্রখ্যাত অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবু আহমেদ। সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ, উচ্চ সুদের হার, জ্বালানি সংকট থেকে শুরু করে শেয়ারবাজারের মন্দা ও কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধির মতো স্পর্শকাতর নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অর্থনৈতিক প্রতিবেদক ওবায়দুর রহমান
প্রশ্ন: বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও পটভূমি কেমন?
আবু আহমেদ: বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের অর্থনীতি ছিল অত্যন্ত নাজুক ও নিম্নগামী। সেসময় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়ে ১৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছিল, মূল্যস্ফীতি পৌঁছেছিল ১২ শতাংশের কাছাকাছি এবং টাকার দ্রুত অবমূল্যায়ন ঘটছিল। এর ওপর ব্যাংক খাত আগে থেকেই এক নজিরবিহীন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। তবে কিছু উদ্যোগের ফলে বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে এসেছে এবং আন্তর্জাতিক দেনা পরিশোধ কিছুটা নিয়মিত করা সম্ভব হচ্ছে। তা সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ বাজার ও উৎপাদন খাতে মন্দা এখনো কাটেনি।
প্রশ্ন: বর্তমানে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাতের মূল সংকটগুলো কী?
আবু আহমেদ: অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুটি বাধা হলো জ্বালানি সংকট ও অস্বাভাবিক সুদের হার। প্রথমত, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পেট্রোলিয়ামের সংকট শিল্প উৎপাদনকে স্থবির করে দিয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এলএনজি আমদানিতে বিপুল খরচ হচ্ছে, যা মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। দ্বিতীয়ত, মূল্যস্ফীতি কমানোর উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক রেপো রেট বা নীতিগত সুদের হার সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছিল। এর ফলে ব্যাংকগুলোয় ঋণের সুদের হার ১৫-১৬ শতাংশে পৌঁছেছে। এত চড়া সুদে ঋণ নিয়ে কোনো ব্যবসায়ী লাভজনক প্রতিষ্ঠান চালাতে পারছেন না। ফলস্বরূপ, বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা নেমে এসেছে মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশে, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।
প্রশ্ন: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও শিল্প উৎপাদনে ভারসাম্য আসবে কীভাবে?
আবু আহমেদ: শুধু নীতিগত সুদের হার বা রেপো রেট বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি দমন করার নীতি এখানে কার্যকর হচ্ছে না; বরং এতে সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উৎপাদন না বাড়লে এবং পণ্যের সরবরাহ বজায় না থাকলে শুধু ঋণের মূল্য বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কমানো সম্ভব নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত রেপো রেট অন্তত ৮ শতাংশে নামিয়ে আনা, যাতে সুদের হার কমে এবং উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে উৎসাহিত হন। উৎপাদন বাড়লেই বাজার স্থিতিশীল হবে এবং সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমবে।
প্রশ্ন: রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও বন্ধ কারখানা নিয়ে আপনার পরামর্শ কী?
আবু আহমেদ: সরকারের অধীনে থাকা অলাভজনক ও বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ওপর বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এগুলো ফেলে না রেখে দ্রুত বেসরকারি খাতে হস্তান্তর করা উচিত, অথবা শেয়ারবাজারে অফলোড করে এগুলোকে পুনরায় চালুর ব্যবস্থা করা উচিত। এতে একদিকে সরকারের লোকসান কমবে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এ ছাড়া যমুনা ও পদ্মা সেতুর মতো লাভজনক জাতীয় অবকাঠামো থেকে সুকুক (ইসলামিক বন্ড) বা সাধারণ বন্ড ইস্যু করে মূলধন তোলা যেতে পারে।
প্রশ্ন: দেশের শেয়ারবাজার নিয়ে আপনার মূল্যায়ন ও পরামর্শ কী?
আবু আহমেদ: শেয়ারবাজার দীর্ঘদিন ধরে গভীর আস্থার সংকটে ভুগছে। বাজারকে গতিশীল করতে সরকারের উচিত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এবং লাভজনক সরকারি প্রকল্পগুলোর বন্ড বা শেয়ার বাজারে ছাড়া। এতে একদিকে বাজারে মানসম্মত সিকিউরিটিজের জোগান বাড়বে ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে, অন্যদিকে সরকারও মূলধন পেয়ে নিজেদের ঋণভার কমাতে পারবে।
প্রশ্ন: টেকসই অর্থনীতি নিশ্চিত করতে আর কী ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন?
আবু আহমেদ: আমাদের বন্দর ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় ব্যাপক গতিশীলতা ও দক্ষতা আনা জরুরি। উদাহরণস্বরূপ, চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস ও ছাড় করতে যেখানে ১২ দিন বা তার বেশি সময় লাগে, বিশ্বমানের বন্দরে তা মাত্র এক বা দুই দিনে সম্ভব হয়। এমন ধীরগতি আমাদের রপ্তানি ও আমদানির খরচ বহু গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বর্তমানে আনুমানিক ৩ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে, যা কর্মসংস্থান তৈরি
করতে পারছে না। তাই সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত, সাহসী ও কার্যকর সংস্কারমূলক পদক্ষেপ না নিলে সংকটের গভীরতা আরও বাড়তে পারে।



