বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন
গরিব দেশগুলো সর্বোচ্চ সুদে ঋণ নিচ্ছে
- সুদহার ৩৭ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ
- বাড়ছে পরিশোধ ব্যয়, কমছে বিনিয়োগ
- ঋণ বেড়ে ৯ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলারে

বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিদেশি ঋণ (বৈদেশিক ঋণ) বেড়ে রেকর্ড ৯ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছে। ২০২৫ সালে এসব দেশের বিদেশি ঋণ বেড়েছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ, যা ২০২১ সালের পর সর্বোচ্চ এবং ২০২২-২৪ সালের গড় বৃদ্ধির প্রায় চার গুণ। আন্তর্জাতিক অর্থায়নে প্রবেশাধিকার বাড়লেও ঋণের খরচ কমেনি। বিশেষ করে দরিদ্র দেশগুলোকে কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ সুদহারে ঋণ নিতে হচ্ছে। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ‘ইন্টারন্যাশনাল ডেট রিপোর্ট ২০২৬’-এ এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেসরকারি ঋণদাতাদের ফিরে আসা এবং আন্তর্জাতিক বন্ড বাজার আবার চালু হওয়ায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণ গ্রহণ বেড়েছে। তবে ঋণের বোঝা ও সুদ পরিশোধের চাপও বাড়ছে।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রধান পরিসংখ্যানবিদ ও উন্নয়ন তথ্য বিভাগের পরিচালক হাইশান ফু বলেছেন, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় বেসরকারি ঋণদাতাদের ফিরে আসা ইতিবাচক। তবে এসব দেশ আরও বেশি ঋণ নিচ্ছে, বেশি সুদ দিচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য অর্থ কম রাখছে। দায়িত্বশীলভাবে ঋণ ব্যবস্থাপনা করতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নয়নের সুযোগও সংকুচিত হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বেসরকারি খাত থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধির কারণে ঋণ বেড়েছে। সরকারি সংস্থাগুলোর বন্ড ইস্যু প্রায় ৩৫ শতাংশ বেড়ে ২৫১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ) থেকে স্বল্পসুদে ঋণ পাওয়ার যোগ্য দেশগুলোর বিদেশি ঋণ সবচেয়ে দ্রুত বেড়েছে। ২০২৫ সালে এসব দেশের ঋণ ৮ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
দরিদ্র দেশগুলোর ঋণ নেওয়ার খরচ আরও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালে আইডিএ-যোগ্য দেশগুলো বেসরকারি ঋণদাতাদের কাছ থেকে নতুন ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে গড়ে ৮ দশমিক ২ শতাংশ সুদ দিয়েছে। ১৯৮৯ সালের পর এটিই সর্বোচ্চ। নতুন বন্ড ইস্যুতে সুদ দিতে হয়েছে গড়ে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক পুনর্গঠন ও উন্নয়ন ব্যাংক (আইবিআরডি) থেকে ঋণ নেওয়ার যোগ্য দেশগুলোর নতুন বন্ডে গড় সুদহার ছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। আগের বছর এই হার ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ঋণ পরিশোধের চাপও অব্যাহত। ২০২৫ সালে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো মূল ঋণ ও সুদ বাবদ মোট ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার পরিশোধ করেছে। আগের বছরের তুলনায় এই ব্যয় বেড়েছে ১ দশমিক ৯ শতাংশ। এ নিয়ে টানা পাঁচ বছর ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বাড়ল। শুধু বন্ডধারীদের পরিশোধ করা অর্থের পরিমাণ বেড়ে ৩৬৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
২০২২-২৫ সাল পর্যন্ত চার বছরে উন্নয়নশীল দেশগুলো নতুন অর্থায়ন পাওয়ার তুলনায় ৪৩৬ বিলিয়ন ডলার বেশি ঋণ পরিশোধ করেছে। তবে ২০২৫ সালে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের প্রবাহে পরিবর্তন এসেছে। ২০২৪ সালে ১১৮ বিলিয়ন ডলারের নিট অর্থপ্রবাহ বেরিয়ে গেলেও ২০২৫ সালে ৪৫ বিলিয়ন ডলারের নিট অর্থপ্রবাহ দেশে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডলারের বিনিময়মূল্যের পরিবর্তনও ঋণ বৃদ্ধির হিসাবকে প্রভাবিত করেছে। সরকারি ও সরকারি নিশ্চয়তাপ্রাপ্ত ঋণের ৩০৩ বিলিয়ন ডলারের বৃদ্ধির এক-চতুর্থাংশের বেশি এসেছে ডলারের দুর্বলতার কারণে। ডলারের বিপরীতে অন্যান্য মুদ্রার মূল্য বাড়ায় সেসব মুদ্রায় নেওয়া ঋণের ডলারমূল্য বেড়েছে। ফলে কয়েকটি বড় স্বল্প সুদের ঋণগ্রহীতা দেশ ২০২৫ সালে মূল ঋণের অর্থ পরিশোধ করলেও ডলারে হিসাব করা তাদের ঋণের পরিমাণ বেড়েছে।



