বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং
ড্রয়ারে বন্দি জিআই, উৎপাদকের ঝুলি শূন্য
- মান নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি, ক্ষতিগ্রস্ত আসল পণ্য
- রপ্তানি কাঠামো দুর্বল, নেই সমন্বিত পরিকল্পনা
- সনদ আছে, নেই বাজারে উপস্থিতি
- সম্ভাবনা বড় হলেও বাস্তবতা সীমিত

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জামদানি বুননের প্রতিটি সুতায় জড়িয়ে থাকে একেকটি জীবনের গল্প। ‘ইলিশ’ কিংবা ‘টাঙ্গাইল শাড়ি’— এসব নাম শুধু পণ্যের পরিচয় নয়, বরং একটি ভূখণ্ড, সংস্কৃতি আর মানুষের অস্তিত্বের প্রতিচ্ছবি। তবু এই ঐতিহ্যের স্বীকৃতি যখন কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে, তখন প্রশ্ন জাগে— জিআই সনদ কি সত্যিই অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে পারছে?
কাগজে-কলমে গুরুত্ব থাকলেও বাস্তবে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) সনদের প্রতিফলন খুব কমই দেখা যাচ্ছে উৎপাদক বা অর্থনীতিতে, ফলে এসব পণ্যের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এর সুফল পৌঁছাচ্ছে না চাষি, কারিগর কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের কাছে।
এই বাস্তবতার মধ্যেই ২৬ এপ্রিল বিশ্ব জুড়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব মেধাস্বত্ব দিবস। দেশে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬২টি পণ্য জিআই সনদ পেয়েছে। যার মধ্যে আছে জামদানি, মসলিন, ইলিশ, টাঙ্গাইল শাড়ি থেকে শুরু করে সুন্দরবনের মধুও। অর্জনের তালিকা যতই দীর্ঘ হোক, আড়ালে রয়ে গেছে এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন— এই স্বীকৃতি কি শুধু কাগুজে, নাকি বাস্তব অর্থনৈতিক পরিবর্তনের হাতিয়ার?
জিআই সনদ মূলত একটি পণ্যের ‘পরিচয়পত্র’, যা তার উৎপত্তিস্থল, বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয়তাকে আইনি স্বীকৃতি দেয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি শুধু সার্টিফিকেট নয়; বরং একটি কার্যকর ‘মার্কেটিং টুল’। আন্তর্জাতিক বাজারে জিআই ট্যাগযুক্ত পণ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ে। ফরাসি শ্যাম্পেন বা সুইস ঘড়ির মতো উদাহরণ দেখায়— এই স্বীকৃতি সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে পণ্য পরিণত হতে পারে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডে।
কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। জামদানি বা বাগদা চিংড়ির মতো পণ্য এখনো করতে পারেনি সেই সম্ভাবনার পূর্ণ সদ্ব্যবহার। সনদ মিললেও বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ব্র্যান্ডিং, প্যাকেজিং ও বাজারজাতকরণ এখনো সীমিত।
পেটেন্ট নকশা ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তরের (ডিপিডিটি) একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানালেন, তাদের প্রধান কাজ হলো জিআই পণ্যের নিবন্ধন কাজ চূড়ান্ত করা এবং এর গুরুত্ব তুলে ধরা। তার দাবি, ‘আমরা প্রি-রেজিস্ট্রেশন থেকে শুরু করে চূড়ান্ত নিবন্ধন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করি। পাশাপাশি জিআইয়ের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি এবং ব্র্যান্ডিং নিয়েও কাজ চলছে।’
জিআই সুরক্ষা আরও কার্যকর করতে একটি অভিন্ন লোগোও তৈরি করা হয়েছে। এই লোগোটি গেজেট আকারে প্রকাশিত হলে বাজারে নকল পণ্য শনাক্ত করা সহজ হবে, যোগ করলেন তিনি। পরিসংখ্যান তুলে ধরে ওই কর্মকর্তা উল্লেখ করলেন, ২০২৩ সালে যেখানে জিআই সনদপ্রাপ্ত পণ্যের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৭টি, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২টিতে।
তবে শুধু সরকারি উদ্যোগে পূর্ণ সুফল পাওয়া সম্ভব নয় বলেও স্বীকার করলেন এই কর্মকর্তা। ব্যবসায়ী, উৎপাদক ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বললেন, ‘নিজেদের পণ্যের সম্ভাবনা তুলে ধরতে না পারলে সেটি সরকারের নজরেও আসবে না।’
বিশেষজ্ঞরাও কথা বলছেন একই সুরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মো. শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকীর মতে, জিআই সনদ কোনো পণ্যের স্বীকৃতি দিলেও এর বাণিজ্যিক সফলতা নির্ভর করে কার্যকর ব্র্যান্ডিং ও বাজারজাতকরণের ওপর। বাংলাদেশে এই জায়গায় বিনিয়োগ ও প্রচারের ঘাটতির কারণেই সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও জিআই পণ্য সফল হচ্ছে না অর্থনৈতিকভাবে।
তার ভাষ্য, অনানুষ্ঠানিক ব্যবসা ও নকল পণ্যের বিস্তার ভোক্তাদের প্রতারিত করছে এবং আসল পণ্যের সুনাম হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত। আইন থাকলেও কার্যকর প্রয়োগ দুর্বল হওয়ায় রয়ে গেছে সমস্যা।
এদিকে, অনুসন্ধানে দেখা যায়, জিআই সনদ প্রান্তিক পর্যায়ে প্রভাব ফেলতে না পারার পেছনে রয়েছে কয়েকটি কাঠামোগত সমস্যা। আন্তর্জাতিক বাজারে সমন্বিত ব্র্যান্ডিংয়ের অভাব, মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য এবং দুর্বল বিপণন ব্যবস্থার কারণে বঞ্চিত হচ্ছেন উৎপাদকরা। অনেক ক্ষেত্রে তারা জানেনই না, কীভাবে এই স্বীকৃতিকে কাজে লাগিয়ে আদায় করা যায় বাড়তি মূল্য।
একই সঙ্গে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মান নিয়ন্ত্রণের অভাব। স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর তদারকি না থাকায় বাজারে নকল বা নিম্নমানের পণ্য আসল নামে বিক্রি হচ্ছে, যা জিআইয়ের মূল উদ্দেশ্যকেই করছে ব্যাহত।
বিশ্লেষকদের মতে, জিআই সনদকে কার্যকর অর্থনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করতে নিশ্চিত করতে হবে মূল্য সংযোজন; যাতে জিআই পণ্যের দাম সাধারণ পণ্যের তুলনায় ২০-৩০ শতাংশ বেশি হয় এবং সেই অতিরিক্ত লাভ সরাসরি পৌঁছায় উৎপাদকের কাছে। পাশাপাশি জিআইভিত্তিক পর্যটন, যেমন জামদানি গ্রাম বা সুন্দরবনের মধু অঞ্চলকে কেন্দ্র করে রয়েছে অ্যাগ্রো-ট্যুরিজম গড়ে তোলার সম্ভাবনাও।
আন্তর্জাতিক বিরোধ মোকাবিলায় কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছেন অধ্যাপক সিদ্দিকী। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আর্থিক সহায়তা ও প্রণোদনার মাধ্যমে এসব পণ্যকে বড় শিল্পে রূপ দেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।
সব মিলিয়ে, জিআই সনদ কোনো শেষ গন্তব্য নয়— বরং সম্ভাবনার দরজা খোলার চাবি। সেই দরজা খুলে ভেতরে ঢোকার মতো পরিকল্পনা ও উদ্যোগই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তাই বিশ্ব মেধাস্বত্ব দিবসে প্রশ্ন একটাই— ড্রয়ারে বন্দি এই সনদ কি শুধু ঐতিহ্যের কাগুজে ঢাল হয়েই থাকবে, নাকি হয়ে উঠবে দেশের প্রান্তিক অর্থনীতিকে বদলে দেওয়ার বাস্তব চালিকা শক্তি?



