চাইনিজ দা-ছুরিতে কমছে দেশি কামারদের বিক্রি

একসময় কোরবানির ঈদ সামনে এলেই দেশের কামারপাড়াগুলোতে শুরু হতো উৎসবের আমেজ। কয়লার আগুনে লাল হয়ে উঠত লোহা, হাতুড়ির টুংটাং শব্দে মুখর থাকত সকাল থেকে গভীর রাত। নতুন দা, ছুরি, চাপাতি কিংবা বটি কিনতে ভিড় জমাতেন ক্রেতারা। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন সেই বাজারের বড় অংশ দখল করে নিচ্ছে বিদেশি, বিশেষ করে চাইনিজ রেডিমেড দা-ছুরি। চকচকে ফিনিশিং আর সহজলভ্যতার কারণে ক্রেতাদের অনেকেই ঝুঁকছেন সেদিকে। ফলে বছরের সবচেয়ে বড় বিক্রির মৌসুম কোরবানির ঈদেও আগের মতো স্বস্তি নেই দেশি কামারদের মধ্যে।
বাড়তি কাঁচামালের দাম, কয়লার খরচ আর কমে যাওয়া বিক্রির চাপে এবার ব্যস্ততার মাঝেও তাদের চোখে স্পষ্ট টিকে থাকার উদ্বেগ।
ঈদ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন হাট-বাজার ও কামারশালায় বেড়েছে ক্রেতাদের আনাগোনা। কেউ অর্ডার দিচ্ছেন নতুন দা-ছুরি বানানোর, কেউবা শান দিয়ে নিচ্ছেন পুরোনো ছুরি-চাপাতিতে। বছরের অন্য সময় কাজ তুলনামূলক কম থাকলেও কোরবানির ঈদকে ঘিরে এই কয়েকটি দিনই হয়ে ওঠে কামারদের সবচেয়ে বড় আয়ের মৌসুম। তাই বাড়তি চাপ সামলেও দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন তারা।
তবে আগের তুলনায় বেড়েছে লোহা ও স্প্রিং দিয়ে তৈরি দা, চাপাতি, ছুরি কিংবা বটির দাম। বড় ছুরির ক্ষেত্রে প্রতি ইঞ্চির জন্য ২০০ টাকা পর্যন্ত দাম হাঁকাচ্ছেন কামাররা, যদিও দরদাম করে অনেক সময় তা বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৫০ টাকায়। অন্যদিকে পুরোনো অস্ত্রে শান দেওয়ার ক্ষেত্রেও গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। ছোট ছুরিতে নেওয়া হচ্ছে ৩০ থেকে ৫০ টাকা এবং বড় ছুরিতে তা গড়াচ্ছে ৮০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত।
আগের তুলনায় অনেক বেশি দাম চায়। শান দিতেও বেশি টাকা নিচ্ছে। কিন্তু কী করব, ঈদের সময় তো ধার দিতেই হবে। মানুষের ভিড়ও অনেক বেশি, তাই মুলামুলি না করেই শান দিয়ে নিচ্ছি
কোরবানির পশুর মাংস কাটার প্রস্তুতি নিতে পুরোনো ছুরি-চাপাতি শান দিতে বাজারে এসেছেন জাহিদুল ইসলাম। তিনি আগামীর সময়কে জানালেন, সারা বছর ব্যবহার না করায় মরিচা পড়ে গেছে ছুরিগুলোতে। ঈদের দিন ধার না থাকলে, কসরত করতে হবে মাংস কাটতে। তাই শান দিতে নিয়ে এসেছেন পুরোনো ছুরি-চাপাতি।
নতুন ছুরি কেনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি তুলে ধরলেন দামের বিষয়টি। ‘আগের তুলনায় অনেক বেশি দাম চায়। শান দিতেও বেশি টাকা নিচ্ছে। কিন্তু কী করব, ঈদের সময় তো ধার দিতেই হবে। মানুষের ভিড়ও অনেক বেশি, তাই মুলামুলি না করেই শান দিয়ে নিচ্ছি।’
তবে শুধু দাম বাড়ার অভিযোগ নয়, বাজারে এখন দেশি কামারদের সামনে নতুন এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদেশি রেডিমেড পণ্য। শপিংমল থেকে ফুটপাত—সবখানেই মিলছে আধুনিক ডিজাইনের চাইনিজ দা-ছুরি ও চাপাতি। মেশিনে তৈরি এসব পণ্যের চকচকে ফিনিশিং সহজেই আকৃষ্ট করছে সাধারণ ক্রেতাদের।
টাঙ্গাইলের পার্ক বাজারে ১৬ বছর ধরে কামারের কাজ করছেন সোবহান মিয়া। বাজার পরিস্থিতি নিয়ে আক্ষেপ করে বললেন, ‘যে পরিমাণে চাইনিজ ছুরি-চাপাতি বাজারে পাওন যাইতেসে তাতে আমগো এইখানের ছুরি-চাপাতি মানুষ কিনতেসেই না। চাইনিজ ছুরি দিয়া একবার কাম করলে পরেরবার আর কাম করা যায় না, কিন্তু এই লোহার পাতের ছুরি দিয়া বছরের পর বছর কাম করতে পারবো, মাংস কাটতে পারবো। প্রত্যেকবার ধার দিলেই নতুন হইয়া যাবো। কিন্তু মানুষ এইটা বুঝে না। তারা শুধু চকচকা জিনিস কিনতে চায়।’



