যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব প্রসঙ্গে সিপিডি
বাড়তি শুল্কে ঝুঁকিতে রপ্তানি

প্রতীকী ছবি
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের যে বাণিজ্যচুক্তি হয়েছে, তা নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান।
তার মতে, মার্কিন প্রশাসনের অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ রপ্তানি প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশি পণ্যকে চরম ঝুঁকিতে ফেলবে। শিশুশ্রমের অজুহাতে শুল্ক না বাড়িয়ে বরং এ সংকট সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা তহবিল গঠনের পরামর্শও দিতে চান তিনি।
গতকাল বৃহস্পতিবার ‘স্টেট অব দ্য বাংলাদেশ ইকোনমি (২০২৫-২৬)’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব কথা বললেন ড. মোস্তাফিজুর রহমান। ঢাকার একটি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।
গত মঙ্গলবার মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় ৬০টি দেশের পণ্যে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেয়। তাদের অভিযোগ, জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে তৈরি পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপে ব্যর্থ এসব দেশ। সে কারণে দেশগুলোর পণ্যে আরও ১০ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক আরোপ করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। এখন দেশটির বাজারে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে গড় শুল্ক ১৫ শতাংশ। নতুন চুক্তি ও বিশেষ ক্ষমতার (৩০১ ধারা) অতিরিক্ত শুল্ক মিলে ভবিষ্যতে এর মোট হার দাঁড়াবে ৪৪ শতাংশে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো প্রশ্ন রেখে বললেন, ‘বৈষম্যমূলক শুল্ক কাঠামোর ভেতর দাঁড়িয়ে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কোথায় গিয়ে ঠেকবে? যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই শিশুশ্রম বন্ধ করতে চায়, তবে বাংলাদেশের রপ্তানিতে শুল্কের বোঝা না চাপিয়ে এই শিশুশ্রম নিরসনে বাংলাদেশকে সুনির্দিষ্ট একটি সহায়তা তহবিল দিতে পারত। শাস্তিমূলক ব্যবস্থার চেয়ে এ ধরনের ইতিবাচক সহযোগিতার ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় আলাপ-আলোচনা জরুরি।’
যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি শুল্কারোপের এই চুক্তি করেনি, তাদের ১৯ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক দিতে হচ্ছে না বলেও জানালেন তিনি। বললেন, ‘পাল্টাপাল্টি শুল্ক যেখানে ৬০টি দেশের ওপর বসানো হয়েছিল, সেখানে মাত্র ৯টি দেশ এই চুক্তি করেছে।’ এর পেছনে ওয়াশিংটনের ভূরাজনীতি ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য কৌশলের বড় প্রভাব রয়েছে বলেও মত তার।
ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৮ (ক) ধারাটি নিয়েও অনুষ্ঠানে আলোচনা হয়। সিপিডির আলোচনায় উঠে আসে, এ ধরনের একতরফা সিদ্ধান্তের ফলে পুরো রেজল্যুশনে বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হওয়ার ঝুঁকির প্রসঙ্গ। সিপিডির মতে, এই নীতি সংশোধন না হলে বড় ঋণগ্রহীতাদের সময়সীমা আরও সমস্যাসংকুল হবে, যা ব্যাংক খাতের সংস্কার প্রক্রিয়াকে পিছিয়ে দেবে। সব স্তরে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেয়ে শেষ পর্যন্ত দেশের বিনিময় হারের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করে সিপিডি।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলছিলেন, ‘কাগজে-কলমে ঋণ কমার অর্থ এই নয় যে ব্যাংকের স্বাস্থ্য ভালো হয়েছে। নির্বাচনের আগে বিশেষ সুবিধায় প্রচুর ঋণ রি-শিডিউল ও পুনর্গঠন করার কারণে খেলাপি ঋণ সাময়িকভাবে কম দেখানো হয়েছে। এরই মধ্যে মাত্র ছয়টি ব্যাংকের অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ করা হয়েছে। বাকিগুলোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষ হলে এই চিত্র আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। অন্যদিকে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা বিনিয়োগের তীব্র মন্দাকেই নির্দেশ করে।’
সিপিডি জানায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল পর্যন্ত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার মাত্র ৩৫ দশমিক ৪ শতাংশ এবং জুলাই-মার্চ পর্যন্ত সামগ্রিক বাজেট ব্যবহারের হার ৫১ দশমিক ৭ শতাংশ। এনবিআর ও এনবিআরবহির্ভূত উভয় খাতেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব আদায় অনেক কম। ক্রমান্বয়ে উন্নয়ন খাতের ব্যয় কমলেও অনুন্নয়ন বা পরিচালন ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে।
দেশের বর্তমান ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতিকে সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা হিসেবে অভিহিত করেন ড. ফাহমিদা খাতুন। বাজার সিন্ডিকেট এবং একচেটিয়া বাজার নিয়ন্ত্রণকারীদের সমালোচনা করে তিনি বললেন, ‘সরবরাহ শৃঙ্খলে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে মধ্যস্বত্বভোগীদের সংখ্যা কমিয়ে এনে একটি শক্তিশালী রেগুলেটরি কাঠামো গঠন করতে হবে।’
এ ছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে কৃষকদের রক্ষায় ‘সহনশীল ফান্ড’ গঠন, আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে দেশীয় খনিজ অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত সম্প্রসারণ করাসহ বেশ কিছু সুপারিশও দেয় সিপিডি।





