ধাপে ধাপে হাতবদলে উধাও সার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সরকারি হিসাবে আমন মৌসুমে রাজশাহীতে বেড়েছে সারের বরাদ্দ। কিন্তু মাঠের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। অনুমোদিত ডিলারের দোকানে গিয়ে কৃষকরা শুনছেন— ‘সার নেই’। অথচ একই সার পাশের খুচরা দোকানে মিলছে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে। ফলে সার কিনতে বাড়তি খরচের চাপে পড়ছেন কৃষকরা। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে সার বিতরণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে। কেউ কেউ বলছেন, কয়েক ধাপে হাত বদলের কারণেই সংকট আরও বাড়ে।
রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) অনুমোদিত অধিকাংশ ডিলারের দোকানে ভর্তুকি মূল্যের সার পাওয়া যাচ্ছে না। তবে একই বাজারের খুচরা বিক্রেতারা প্রকাশ্যেই বেশি দামে টিএসপি ও ডিএপি বিক্রি করছেন। সরকার নির্ধারিত দামে ৫০ কেজির এক বস্তা ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) সারের দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা এবং ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) ১ হাজার ৫০ টাকা। কিন্তু তারা টিএসপি কিনছেন ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। ডিএপির জন্য দিতে হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা।
রাজশাহীর নওহাটা বাজারে বিএডিসির অনুমোদিত ডিলার মেসার্স হক অ্যান্ড সন্স এন্টারপ্রাইজে গিয়ে কোনো ভর্তুকির সার পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটির মালিক আবদুল হক বললেন, ‘জুলাই মাসে আমি মাত্র ২২ বস্তা টিএসপি, ৭০ বস্তা এমওপি এবং ১১০ বস্তা ডিএপি পেয়েছি। অথচ আমার অধীনে ৪২টি মৌজার কয়েক হাজার কৃষক রয়েছেন। বরাদ্দ পাওয়া সার দুই-তিন দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়।’ একই বাজারে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অনুমোদিত আরেক ডিলারের দোকানে প্রথমে জানানো হয়, সার শেষ হয়ে গেছে। পরে প্রতিষ্ঠানটির মালিক ফজলুর রহমান বললেন, ‘আমাদের কাছে সার রয়েছে।’
তবে ওই ডিলারের পাশের একটি খুচরা দোকানে ৫০ কেজির এক বস্তা ডিএপি বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হয় ১ হাজার ৬০০ টাকায়। সরকারি দামের চেয়ে যা ৫৫০ টাকা বেশি। ওই খুচরা বিক্রেতা বললেন, ‘বিভিন্ন উৎস থেকে সার সংগ্রহ করতে হয়। ভর্তুকির সার কৃষকের হাতে পৌঁছানোর আগে তিন থেকে চার ধাপে হাতবদল হয়।’
সরকারি তথ্য বলছে, রাজশাহী কৃষি অঞ্চলের আওতাধীন রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় এবার ৪ লাখ ১০ হাজার হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে রাজশাহী জেলায় টিএসপি, ডিএপি ও এমওপির মোট বরাদ্দ ছিল ৫ হাজার ৮৭৬ টন। চলতি বছরের জুলাইয়ে তা বেড়ে হয়েছে ৭ হাজার ৩৩ টন। আগস্ট মাসেও তিন ধরনের সারের বরাদ্দ আগের বছরের তুলনায় বেশি। টিএসপির বরাদ্দ ১ হাজার ৪৩০ টন থেকে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৫১১ টন। ডিএপি ২ হাজার ৪০৪ টন থেকে বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৬৪৭ টন। এমওপি ১ হাজার ৭০৯ টন থেকে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৭৬০ টন।
বিএডিসির রাজশাহীর সহকারী পরিচালক (সার) মো. নাসির উদ্দিন বললেন, ‘ডিলারদের বরাদ্দ কম পাওয়ার অভিযোগ থাকলেও আমরা কৃষি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত পরিমাণ অনুযায়ীই সার সরবরাহ করি। মন্ত্রণালয় যতটুকু বরাদ্দ দেয়, আমরা ততটুকুই দিতে পারি।’ তিনি বলেছেন, ‘অনেক কৃষক সুপারিশকৃত মাত্রার চেয়ে বেশি সার ব্যবহার করেন। এ কারণে মৌসুমি চাহিদা বেড়ে যায়।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আবদুল ওয়াদুদ বললেন, ‘বরাদ্দ বাড়ার পরও কৃষকরা সার না পাওয়ার বিষয়টি শুধু সরবরাহের সমস্যা নয়, এটি দুর্বল তদারকিরও প্রমাণ। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে মনিটরিং।’
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ডিডি) আজিজুর রহমান বলেছেন, ‘সারের সংকট নিয়ে এখনো আমাদের কাছে কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি।’
জেলা সার বিতরণ কমিটির সভাপতি ও রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেছেন, ‘অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’




