প্রতিবেদন
বাংলাদেশের এলএনজি চাহিদা নিয়ে শেলের পূর্বাভাস অতিরঞ্জিত

সংগৃহীত ছবি
আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি শেল সম্প্রতি বৈশ্বিক এলএনজি চাহিদার পূর্বাভাস প্রকাশ করেছে। তাতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের এলএনজি চাহিদা বৃদ্ধির যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে তা অতিরঞ্জিত বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এনার্জি ফ্লাক্স। ‘এশিয়ার এলএনজি চাহিদা: বাস্তবতা যাচাই’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে।
এনার্জি ফ্লাক্স বলছে, বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলোর পক্ষে শেলের এলএনজি আউটলুক-২০২৬ এ উল্লেখ করা দ্রুতগতির এলএনজি আমদানি বৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হবে না। বরং সাম্প্রতিক আমদানি প্রবণতা, এলএনজির মূল্য বৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তা নীতি এবং হরমুজ প্রণালি সংকট-পরবর্তী পরিস্থিতি দেশগুলোকে আরও সতর্ক অবস্থানে নিয়ে গেছে। এলএনজির পরিবর্তে অধিকাংশ দেশই এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
শেলের বার্ষিক এলএনজি আউটলুক বৈশ্বিক গ্যাস বাণিজ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী পুর্বাভাস দানকারী প্রতিবেদন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এবারের প্রতিবেদনে শেল বলছে, ২০৫০ সালে বিশ্বে এলএনজির চাহিদা বছরে প্রায় ৬৮৫ মিলিয়ন টনে পৌঁছাবে। যা ২০২৫ সালের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি। অতিরিক্ত এই চাহিদার প্রায় পুরোটাই এশিয়ায় দেখা দেবে।
শেলের মতে, এশিয়ার দেশগুলোর ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দ্রুত নগরায়ন এবং দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়াই এই চাহিদা বৃদ্ধির প্রধান কারণ হবে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০৫০ সালে বিশ্ববাজারে প্রায় ২০০ মিলিয়ন টন এলএনজি সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হবে। ফলে নতুন এলএনজি প্রকল্পে আরও বিনিয়োগ ছাড়া এই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে না।
এনার্জি ফ্লাক্স বলছে, এই পুরো বিশ্লেষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুমানের ওপর নির্ভর করছে—২০৩০-এর দশকের শুরুতে এশিয়ায় এলএনজির চাহিদা দ্রুত বাড়বে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, হরমুজ সংকটের পর এশিয়ার দেশগুলো জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবছে এবং অস্থির বৈশ্বিক এলএনজি বাজারের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে। ফলে শেল এর এই অনুমান ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এনার্জি ফ্লাক্স বলছে, ভবিষ্যতে এলএনজির চাহিদা নির্ধারণে কয়েকটি বড় সীমাবদ্ধতা কাজ করবে। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চ আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, সীমিত রিগ্যাসিফিকেশন অবকাঠামো, দেশীয় গ্যাস উৎপাদনের অবস্থা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ।
এনার্জি ফ্লাক্স জানিয়েছে, তাদের প্রক্ষেপণ ডিসেম্বর ২০০৭ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত পণ্যবাজার বিষয়ক তথ্যপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার এর এলএনজি জাহাজ চলাচলের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। এই বিশ্লেষণে বাংলাদেশসহ এশিয়ার ১৪টি দেশের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দেশগুলো হলো—বাংলাদেশ, চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন, তাইওয়ান ও মিয়ানমার।
শেল ধারণা করছে চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া বাদে এশিয়ার বাকি দেশগুলোতে—এলএনজির চাহিদা ২০২৫ সালের প্রায় ১৭০ মিলিয়ন টন থেকে ২০৫০ সালে প্রায় ৪২০ মিলিয়ন টনে পৌঁছাবে।
অন্যদিকে এনার্জি ফ্লাক্সের হিসাব অনুযায়ী, একই দেশগুলোতে উচ্চ প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে চাহিদা দাঁড়াবে ৩৪৩ মিলিয়ন টন, আর মধ্যম প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে হবে ২৬৫ মিলিয়ন টন। দুটি হিসাবই শেল এর পূর্বাভাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও কাতার থেকে বিপুল পরিমাণ নতুন এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতা যুক্ত হওয়ায় ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক এলএনজি বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হবে—এমন ধারণাই এতদিন বাজারে প্রধান আলোচ্য ছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য সংকটে হুমকিতে পড়েছে।
এনার্জি ফ্লাক্স বলছে, এই উদ্বেগ কমাতে শেল তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ সরবরাহ এবং চাহিদা—দুটোরই পূর্বাভাস বাড়িয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেল এখন আশা করছে ২০৩০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে নিশ্চিত এলএনজি সরবরাহ তাদের ২০২৫ সালের পূর্বাভাসের তুলনায় প্রায় ৪৬ মিলিয়ন টন বেশি হবে। একই সঙ্গে ২০৩২ থেকে ২০৩৬ সালের মধ্যে বছরে অতিরিক্ত ৩০ থেকে ৪৫ মিলিয়ন টন চাহিদা যুক্ত করা হয়েছে। এনার্জি ফ্লাক্সের ভাষায়, এর ফলে একটি অস্থায়ী চাহিদার উল্লম্ফন তৈরি করা হয়েছে, যা সম্ভাব্য অতিরিক্ত সরবরাহ শোষণ করতে পারবে বলে ধরে নেওয়া হয়েছে।
এনার্জি ফ্লাক্সের দাবি, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি এত দ্রুত চাহিদা বৃদ্ধিকে সমর্থন করে না। প্রতিবেদনে চীন ও ভারতের মতো বড় ক্রেতা দেশে এলএনজি আমদানির গতি কমে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি হরমুজ সংকটের পর আমদানিনির্ভর এলএনজির ঝুঁকি সামনে আসায় বিভিন্ন দেশ জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্য করার উদ্যোগও জোরদার করেছে।




