টাইম সাময়িকীর প্রতিবেদন
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে চাপে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প

বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ৫১০ বিলিয়ন বা ৫১ হাজার কোটি ডলার। কিন্তু বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে ব্যাহত হচ্ছে দেশটির শিল্প উৎপাদন। জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক টানাপড়েনে বাড়ছে অনিশ্চয়তা। বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প এখন তীব্র জ্বালানি সংকটের মুখে। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত গ্যাসের দাম বেড়েছে ১৫০ এবং ডিজেলের দাম প্রায় ৭০ শতাংশ। অন্যদিকে ইরান যুদ্ধের পর খোলাবাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্যের দাম বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছেন না রপ্তানিকারকরা।
গত বছর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩ হাজার ৮৭০ কোটি ডলার, যা মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি। এ খাতে সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের। ফলে জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হলে রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের ঘাটতি তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাওয়ায় লোডশেডিং বাড়িয়েছে সরকার। রাজধানীতে সূর্যাস্তের পর বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ডের আলো বন্ধ রাখা হচ্ছে, দোকানপাটও আগেভাগে বন্ধ করা হচ্ছে। জ্বালানি সংকটে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যও ব্যাহত হচ্ছে।
দেশের অভ্যন্তরীণ নীতিগত দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। প্রয়োজনের তুলনায় বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো ও নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানে কম বিনিয়োগের কারণে বাংলাদেশকে জ্বালানির বড় অংশ আমদানি করতে হয়। হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ বিঘ্ন এবং দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে অগ্নিকাণ্ডের কারণে জুলাই থেকে আগস্টের মধ্যে এলএনজি আমদানি ৮৩ শতাংশ কমে যায়।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিও জ্বালানি নিরাপত্তাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। রাশিয়ার ঋণে নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যয় ১ হাজার ২৬৫ কোটি ডলার। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে অর্থ লেনদেন ও পণ্য পরিবহনে জটিলতায় প্রকল্পটির কাজ বিলম্বিত হয়েছে। গত ১১ অক্টোবর কেন্দ্রটিতে প্রথম নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া সম্পন্ন হলেও পূর্ণ উৎপাদনে যেতে আরও কয়েক মাস পরীক্ষা চালাতে হবে।
সংকট মোকাবিলায় ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে প্রণোদনা দিয়েছে সরকার। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ২০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা যুক্ত হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে সরকার নতুন জ্বালানি রোডম্যাপে সৌরবিদ্যুৎ ও কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের মাধ্যমে ১২ হাজার ৯৪০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতা যুক্ত করার লক্ষ্য নিয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং গ্যাস অনুসন্ধানে ৩০০টি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের সুফল পেতে সময় লাগবে। এর মধ্যে জ্বালানির উচ্চ ব্যয় ও অনিশ্চিত সরবরাহ বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে পারে।



