শিক্ষা বাজেটে মেগা জাম্প

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শিক্ষায় গতানুগতিক প্রথা ভেঙে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে চায় সরকার। প্রথমবারের মতো গতানুগতিক বরাদ্দের বাইরে ক্লাসরুমকে ডিজিটালে রূপান্তর, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সাজানো হয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শিক্ষা বাজেট। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সামাজিক সুরক্ষা বাড়ানোর পাশাপাশি থাকবে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস, ব্যাগ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত শিক্ষার্থীদের জন্য থাকবে ২৫০ কোটি টাকার আলাদা প্রকল্প। বুলিং প্রতিরোধে সিসিটিভি বাড়ানো, বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব কর্মসূচি, শিক্ষকদের এআই প্রশিক্ষণের মতো কর্মসূচি।
এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সর্বোচ্চ ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দ পাচ্ছে শিক্ষা খাত, যা মোট জিডিপির ২ শতাংশ। যদিও সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে শিক্ষায় বরাদ্দ ৫ শতাংশে করার অঙ্গীকার রয়েছে। তবে ধীরে ধীরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হবে বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন। তিনি আগামীর সময়ের সঙ্গে আলাপকালে বলছিলেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আমরা শিক্ষায় বড় ধরনের জাম্প দিতে চাই। প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা খাত নিয়ে খুবই আন্তরিক। তিনি আরও বরাদ্দ দিতে চেয়েছেন। কিন্তু হঠাৎ বরাদ্দ এনে তা বাস্তবায়ন করাও বড় চ্যালেঞ্জ। আগামী পাঁচ বছরে শিক্ষায় বরাদ্দ জিডিবির ৫ শতাংশ ঘরে পৌঁছে যাবে— এমনটা প্রত্যাশা মন্ত্রীর।
নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে সরকার বেশি মনোযোগী— এমনটা মিলেছে বাজেট বিশ্লেষণে। গত অর্থবছরে শিক্ষা খাতে মোট বরাদ্দ যেখানে ছিল ৯৭ হাজার ৮০৫ কোটি (জিডিপির ১.৬১ শতাংশ), চলতি বছর তা একলাফে বাড়িয়ে করা হচ্ছে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা (জিডিপির ২ শতাংশ)। এর মধ্যে শুধু মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) বিভাগের জন্যই এবার মোট ৫৭ হাজার ৩০১ কোটি টাকা, যা গত বছরের মূল বাজেটের চেয়ে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সংগতি রেখে ৩৮টি নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
সবচেয়ে আলোচিত ও ব্যতিক্রমী প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে— শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পোশাক, ব্যাগ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ বিতরণের জন্য এককালীন ৫০০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ। জুলাইয়ের আহত শিক্ষার্থীদের ট্রমা কাটাতে নিয়মিত মানসিক কাউন্সিল, ক্লাসরুমে ফিরিয়ে আনতে ২৫০ কোটি টাকার একটি স্কিম রয়েছে। বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, ভোকেশনাল ও আনন্দময় শিক্ষা চালুর জন্য ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের আসন্ন অর্থবছরে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ইশতেহার অনুযায়ী, তৃতীয় ভাষা শেখাতে এ খাতে ব্যয় হবে ৪ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা।
মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ধরে রাখতে এবং ঝরে পড়া ঠেকাতে এসইডিপি কর্মসূচির মাধ্যমে উপবৃত্তির জন্য ২ হাজার ৮৩৩ কোটি টাকা বরাদ্দের মেগা প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া সাধারণ বৃত্তি, মেধাবৃত্তির অনুকূলে আরও ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকছে। বিনামূল্যে বই বিতরণ, বাঁধাই ও মুদ্রণের জন্য ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করতে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকবে। সদ্য জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বকেয়া পাওনা পর্যায়ক্রমে পরিশোধের জন্য ৪৯০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সরকারি মাধ্যমিক স্কুলে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ২ হাজার ৪৭৮ কোটি, সরকারি কলেজে বিজ্ঞান শিক্ষার সম্প্রসারণ প্রকল্পের ৩৮৬ কোটি, মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য লার্নিং এক্সিলারেশন ইন সেকেন্ডারি এডুকেশন (লেইস) প্রকল্পের জন্য ১ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
কারিকুলাম ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা পরিমার্জন, শিক্ষা সংস্কারের জন্য আলাদাভাবে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। জেলা সদরের বড় সরকারি বালক ও বালিকা স্কুলে আধুনিক স্টেম-ফোকাসড বা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে উন্নীতকরণ প্রকল্পের আওতায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১০০ কোটি টাকা।
প্রান্তিক ও তৃণমূল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের শহরের ভালো স্কুলের শিক্ষকদের ক্লাসে পৌঁছে দিতে প্রথমবারের মতো জাতীয় শিক্ষা টিভি চ্যানেল স্থাপন প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। সব বিদ্যালয়ে গ্রিন অ্যান্ড রিনিউঅ্যাবল এনার্জি ও রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং প্রকল্প এবং বৃহৎ জেলা শহরের শিক্ষার্থীদের জন্য গণপরিবহনভিত্তিক যাতায়াত ব্যবস্থা প্রকল্প চালুর জন্য বরাদ্দ রয়েছে। বুলিং প্রতিরোধে মাধ্যমিক পর্যায়ের ৫১৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাইলট ভিত্তিতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং ১ লাখ ১৮ হাজার ৯৮০ শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন, কাউন্সেলিং এবং বুলিং প্রতিরোধ বিষয়ে শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণের জন্য ৯০০ কোটি টাকা খরচ হবে।
শিক্ষকদের এআই প্রশিক্ষণ এবং জলবায়ু অনুদান দেওয়ার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পূর্ণ ফ্রি ওয়াই-ফাইর আওতায় আনা এবং স্মার্ট ক্লাসরুম বিনির্মাণের জন্য আইসিটি সরঞ্জাম খাতে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ৫ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হবে, যা দিয়ে একটি ফলদ ও একটি বনজ গাছ লাগানো, জলবায়ু বিষয়ে দেয়ালিকা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করবে। জলবায়ুর ওপর শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য ৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার অধীনে ১১ হাজার শিক্ষক প্রশিক্ষণ পাবেন। শিক্ষার প্রকল্পের মধ্যে আরও রয়েছে— বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করা শিক্ষার্থীকে প্রথমবারের মতো শিক্ষানবিশ ভাতা দিতে পাইলটিং কার্যক্রম। এজন্য প্রথমবারের মতো ২২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।




