ইসলামী ব্যাংক
৯ দিনে ৫৪০০ কোটি টাকা তুলে নিলেন গ্রাহকরা
- কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ধার চাওয়া হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা

ফাইল ছবি
ইসলামী ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনের হার বেড়ে গেছে অস্বাভাবিকভাবে। ৯ দিনে গ্রাহকরা তুলে নিয়েছেন ৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকার বেশি। এ সময় নতুন আমানত এসেছে ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা। এ অবস্থায় তারল্যসংকটে পড়েছে বেসরকারি খাতে দেশের সবচেয়ে বড় হিসেবে খ্যাত এই প্রতিষ্ঠানটি। এই মুহূর্তে নগদ টাকার সংকট সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি সামাল দিতে গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকা ধার চেয়েছে ব্যাংকটি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে খুরশীদ আলমকে নিয়োগ দেওয়ার পর থেকে গ্রাহকদের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা ও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। যে হারে টাকা তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তাতে একসময় তাদের পক্ষে আর সবাইকে টাকা দেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। এমনকি পরিস্থিতি সামাল দিতে চেয়ারম্যান পরিবর্তন করা হলেও গ্রাহকের আস্থা ততদিনে টিকে থাকবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন খাতসংশ্লিষ্ট অনেকেই।
চট্টগ্রামের আলোচিত ব্যবসায়ী এস আলমের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলম সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন।
সূত্র জানায়, তার এই নিয়োগের পর ব্যাংকের গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। খুরশীদ আলমের পদত্যাগ দাবিতে ‘সচেতন গ্রাহক ফোরামের’ ব্যানারে আন্দোলনও চলছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকের শাখাগুলো থেকে টাকা তুলে নেওয়ার হিড়িক পড়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খুরশীদ আলমের নিয়োগ গত ২৪ মে হলেও ঈদের ছুটি শেষে ১ জুন থেকে ব্যাংক খোলার পর এর প্রভাব পড়তে শুরু করে। ৯ দিনে ব্যাংক থেকে প্রায় ৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন গ্রাহকরা। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকে ইসলামী ব্যাংকের জমা থাকা ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও (সিআরআর) পজিটিভ অবস্থা থেকে নেগেটিভ হয়ে গেছে। সিআরআর বা নগদ সংরক্ষণ হার হলো ব্যাংকের মোট আমানতের একটি নির্দিষ্ট অংশ, যা নগদ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সংরক্ষণ করতে হয়। বর্তমানে দেশের ব্যাংকগুলোকে গড়ে ৪ শতাংশ সিআরআর সংরক্ষণ করতে হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এ অবস্থা চলতে থাকলে ব্যাংকটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গ্রাহকও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তখন বঞ্চিত গ্রাহকদের বাংলাদেশ ব্যাংক আইনের দোহাই দেবে। এসব ঘটনা দেশের অর্থনীতির জন্য খারাপ। সরকারের জন্যও খারাপ।
ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হুসাইন স্বীকার করেন, কিছু গ্রাহক তাদের আমানত তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। গ্রাহকদের আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এই মুহূর্তে আতঙ্কিত হয়ে টাকা তোলার কোনো কারণ নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী বললেন, ‘আমরা ইসলামী ব্যাংককে পর্যবেক্ষণে রেখেছি। গ্রাহকরা নগদ টাকা তুলে নিচ্ছেন, নাকি অন্য ব্যাংকে স্থানান্তর করছেন, সেদিকে লক্ষ রাখা হচ্ছে। ব্যাংকটি এমন অবস্থায় নেই যে তারা গ্রাহকদের চাহিদা পূরণ করতে পারবে না। যদি ইসলামী ব্যাংক তারল্যসংকটে পড়েও, তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সহায়তা দেবে।
ইসলামী ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, খুরশীদ আলমকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার আগে ব্যাংকটির সিআরআর বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত চাহিদার তুলনায় বেশি ছিল। তবে গত এক সপ্তাহে গ্রাহকদের আতঙ্কজনিত অর্থ উত্তোলনের কারণে সোমবার সিআরআর নেগেটিভে চলে গেছে।
ব্যাংকটির চাহিদা প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। এতদিন তার চেয়েও বেশি রাখা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সংকটের কারণে তা কমে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান জোবায়দুর রহমান পদত্যাগ করার পর খুরশীদ আলমকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকে আন্দোলনের মুখে তিনি ডেপুটি গভর্নরের পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। ৫ আগস্টের পর ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড পুনর্গঠন করা হয়। তখন চেয়ারম্যান করা হয় ওবায়েদ উল্লাহ মাসুদকে। তার বিরুদ্ধেও আন্দোলন করেছিলেন গ্রাহকরা। বাংলাদেশ ব্যাংক তখন তা আমলে নেয়নি। পরে তিনি দুর্নীতির মামলায় কারাগারে যান।
এদিকে খুরশীদ আলমের নিয়োগ বাতিল দাবিতে গতকাল ‘ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে টানা ৯ দিনের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। গতকাল ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের সামনে কয়েক হাজার নারী-পুরুষ গ্রাহক অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। তারা খুরশীদ আলমকে চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারণের দাবি জানান।




