নিরাপত্তা শঙ্কায় যাত্রা ডিজিটাল ব্যাংকের
- কড়ি ডিজিটাল ব্যাংক
- ডিজিটাল ব্যাংকিং অব ভুটান
- বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক
- নোভা ডিজিটাল ব্যাংক
- বুস্ট ডিজিটাল ব্যাংক

সংগৃহীত ছবি
ডিজিটাল ছোঁয়ায় আর শাখা-উপশাখা নয়, মোবাইল ফোনে হাতের মুঠোয় মিলবে ব্যাংকিং সেবা। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবার নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করতে যাচ্ছেন গ্রাহকরা। সম্প্রতি পাঁচটি ডিজিটাল ব্যাংককে লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বড় মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা, টেলিযোগাযোগ ও শিল্পগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততায় এসব ব্যাংক চালু হলে প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি আর্থিক সেবার বাজারে তৈরি হবে নতুন এক প্রতিযোগিতামূলক পরিসর। তবে প্রযুক্তির হাত ধরে ব্যাংকিং সেবা আরও সহজ এবং বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনার পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা, গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন নিশ্চিত করাই হবে নতুন ব্যাংকগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় চারটি নতুন ডিজিটাল ব্যাংকের প্রাথমিক অনুমোদন দেওয়া হয়। ব্যাংকগুলো হলো— ডিজিটাল ব্যাংকিং অব ভুটান, যার উদ্যোক্তা ভুটানের ডিকে ব্যাংক; বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক, যার উদ্যোক্তা বিকাশের শেয়ারধারীরা; নোভা ডিজিটাল ব্যাংক, যার উদ্যোক্তা বাংলালিংকের মূল প্রতিষ্ঠান ভিওন ও স্কয়ার গ্রুপ এবং বুস্ট ডিজিটাল ব্যাংক, যার উদ্যোক্তা রবির মূল প্রতিষ্ঠান আজিয়াটা লিমিটেড। পাশাপাশি আগেই প্রাথমিক অনুমোদন পাওয়া কড়ি ডিজিটাল ব্যাংককে লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে আবেদনকালে শর্ত দেওয়া হয়েছে। সেখানে সাইবার সিকিউরিটিসহ অন্য বিষয়গুলো তারা কীভাবে পরিচালনা করবে, তার উল্লেখ রয়েছে। এখন প্রতিষ্ঠানগুলো শর্তপূরণ করে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে তারা প্রস্তুত। এরপর আমরা সেটা ভেরিফিকেশন করে যদি সবকিছু ঠিক পাই, তাহলে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হবে।
তথ্য বলছে, ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ২০২৩ সালে। সেসময় দেশি-বিদেশি ৫২টি প্রতিষ্ঠান ও জোট ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স পেতে আবেদন করে। ওই দফায় কড়ি ও নগদ ডিজিটাল ব্যাংককে এলওআই দেওয়া হয়েছিল। পরে শর্ত পূরণের ব্যর্থতায় কড়ির অনুমোদন স্থগিত হয়ে যায়। ফলে প্রতিষ্ঠানটিকে ফের নতুন শর্তে এলওআই দেওয়া হয়। পরে নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হয়। ২০২৫ সালে নতুন করে আবেদন গ্রহণ করা হলে ১২টি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্সের জন্য আবেদন করে। এসব আবেদনের মধ্যে ছিল মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা, মোবাইল অপারেটর, শিল্পগোষ্ঠী ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ। আগের দফার অভিজ্ঞতা এবং নতুন নীতিমালার আলোকে এবার পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে এলওআই দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলো।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ডিজিটাল ব্যাংকের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা মূলধনের শর্তও কঠোর করেছে। সংশোধিত নির্দেশনা অনুযায়ী, একটি ডিজিটাল ব্যাংকের ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ৩০০ কোটি টাকা। আগের নীতিমালায় এ সীমা ছিল ১২৫ কোটি টাকা। মূলধনের পরিমাণ বাড়ানোর ফলে ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় উদ্যোক্তাদের আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের ‘ফিট অ্যান্ড প্রপার’ হওয়ার শর্তও প্রযোজ্য হবে। ব্যাংকিং ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন, সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে।
তথ্য বলছে, ডিজিটাল ব্যাংকের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হবে এর কার্যক্রম পরিচালনার ধরনে। প্রচলিত ব্যাংকের মতো শাখা, উপশাখা কিংবা কাউন্টারনির্ভর সেবা দেওয়ার পরিবর্তে ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গ্রাহকের সঙ্গে ব্যাংকের সম্পর্ক তৈরি হবে। অ্যাকাউন্ট খোলা, টাকা স্থানান্তর, আমানত, ঋণ, বিল পরিশোধসহ বিভিন্ন সেবা প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ার কথা। ফলে ব্যাংকের শাখা স্থাপন ও পরিচালনার খরচ কমতে পারে। একই সঙ্গে গ্রাহকের কাছে দ্রুত সেবা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো। বিশেষ করে প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের বাইরে থাকা জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ছোট ব্যবসায়ীদের ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনা। প্রযুক্তির মাধ্যমে গ্রাহকের লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ করে ঋণযোগ্যতা নির্ধারণ করা গেলে প্রচলিত ব্যাংকের বাইরে থাকা অনেক গ্রাহকও ঋণের সুযোগ পেতে পারেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম লক্ষ্য, ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়া। বিশেষ করে যাদের জন্য ব্যাংকের শাখায় যাওয়া ব্যয়বহুল বা সময়সাপেক্ষ, তাদের মোবাইলভিত্তিক ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনা ডিজিটাল ব্যাংকের বড় সম্ভাবনা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটাভিত্তিক ক্রেডিট স্কোরিং ব্যবহার করে ঋণগ্রহীতার সক্ষমতা যাচাইয়ের পরিকল্পনাও আগে ডিজিটাল ব্যাংক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। এখানেই রয়েছে চ্যালেঞ্জ। ডিজিটাল ব্যাংকের ব্যবসা মূলত প্রযুক্তি, তথ্য ও অ্যালগরিদমনির্ভর হওয়ায় সাইবার জালিয়াতি, গ্রাহকের তথ্যের নিরাপত্তা, পরিচয় যাচাই এবং প্রযুক্তিগত বিপর্যয় সামলানোর সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সাইবার নিরাপত্তা। ব্যাংকের প্রায় পুরো কার্যক্রম প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ায় সাইবার হামলা, গ্রাহকের তথ্য চুরি, পরিচয় জালিয়াতি, অ্যাকাউন্ট দখল ও ডিজিটাল প্রতারণা ঠেকানো বড় চ্যালেঞ্জ হবে।



