সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক
৭৫ লাখ গ্রাহকের হাহাকার
- দেওয়া হয়েছে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা, বাকি দেড় লাখ কোটি
- নতুন ঋণ ও এলসি নেই, পরিশোধ হচ্ছে না আমদানির বকেয়া বিল
- এলসি বিল বকেয়ার দায়ে বিদেশে নস্ট্র অ্যাকাউন্ট ফ্রিজসহ ৩ ব্যাংকের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে মামলা
- লুটপাটে জড়িতদের দ্রুত সব ব্যাংক হিসাব জব্দসহ কঠোর শাস্তি দাবি

সংগৃহীত ছবি
লুটপাট হওয়া পাঁচ শরিয়াহ ব্যাংক একীভূত করে আট মাস আগে যাত্রা শুরু সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের। অতীত গ্লানি ঢাকতে সরকারের এমন সিদ্ধান্তে গভীর হতাশায় থাকা আমানতকারী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে হঠাৎ জ্বলে ওঠে আশার প্রদীপ। কিন্তু সেটি এখন নিভু নিভু। দুই লাখ টাকা পাওয়ার পর বাকি অংশের কোনো খবর নেই। সেটি কবে পাওয়া যাবে— সুনির্দিষ্টভাবে তা বলতে পারেন না কেউ। আর ব্যবসায়ীরা আছেন মহাসংকটে— না পারছেন নতুন ঋণ নিয়ে এলসি (ঋণপত্র) খুলতে।
আবার পরিশোধ করতে পারছেন না আগের আমদানি পণ্যের এলসির বকেয়া বিল। পাশাপাশি ঋণ নিতে পারছেন না অন্য ব্যাংক থেকেও। কারণ স্থানান্তর করতে পারছেন না এসব ব্যাংকে রাখা বন্ধকি সম্পদ। শুধু তা-ই নয়, এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের বাইরেও। এর মধ্যে এলসির দায় শোধের ব্যর্থতায় সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের (এসআইবিএল) নস্ট্রা হিসাব ফ্রিজসহ অন্তত তিনটি ব্যাংকের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে মামলা করা হয়েছে। সব মিলিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে চলছে ৭৫ লাখ গ্রাহকের হাহাকার। একীভূত পাঁচ ব্যাংক, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলাপ করে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পক্ষে এলসির দায় শোধ করার মতো কোনো অবস্থা নেই। যদিও সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তায় একটি এলসি বিল নিষ্পত্তি করা হয়েছে। আর অন্যান্য এলসি বিল পরিশোধে বারবার সময় চাওয়া হচ্ছে; কিন্তু কোনো প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা যাচ্ছে না। আর এসআইবিএলের এলসির দায় পরিশোধে ব্যর্থতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে ব্যাংকটির নস্ট্র হিসাব (বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে বিদেশি ব্যাংকে খোলা হিসাব হলো নস্ট্র) ফ্রিজ করার জন্য মামলা করা হয়েছে। একটি কন্ট্রাক্ট ফার্ম দেশের পক্ষে কাজ করছে। এ ছাড়া আরও দুটি ব্যাংকের বিরুদ্ধে আইনিব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এসব কারণে নতুন করে অতিরিক্ত সুদ চার্জ করছে বিদেশি ব্যাংকগুলো। শুধু তা-ই নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেশের অন্যান্য ব্যাংকের সঙ্গে এলসি চুক্তি করতে অনীহা দেখাচ্ছে। আর করলেও অতিরিক্ত কমিশন ও চার্জ গুনতে হচ্ছে। এসব ব্যাংকের কারণে দেশের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে আমদানি-রপ্তানির স্বাভাবিক গতি।
জানা গেছে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে বকেয়া এলসির সুর্নিিদষ্ট সংখ্যা কেউ বলছেন না। তবে বকেয়া এলসির পরিমাণ ৩০০ কোটি (তিন বিলিয়ন) ডলার ছাড়িয়েছে। গত মে মাসে দেশের মান রক্ষায় দুটি বড় এলসির বিল পরিশোধ করা হয়।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান কাজী শায়রুল হাসান আগামীর সময়ের কাছে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের হিসাব ফ্রিজের মামলার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বললেন, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের মামলার বিষয়টি দেখভালের জন্য একটি ফার্মের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। তারা এটি নিয়ে লড়বে। অন্য ব্যাংকের বকেয়া এলসি পরিশোধ করতে না পারায় আমাদের ব্যাংকের ওপর আস্থা কমে যাচ্ছে। এ সংকট দূর করতে যৌথ উদ্যোগের প্রয়োজন। অন্যথায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেটিং ডাউন হবে। বিষয়টি সম্পর্কে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এজন্য সময় দরকার। গণমাধ্যমসহ সবারই সহযোগিতা লাগবে। ব্যাংককে সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠা করতে এরই মধ্যে কারিগরি টিম কাজ করছে। আমাদের প্রধান লক্ষ্য হবে আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক জাতির কাছে আস্থার প্রতীক হয়ে উঠবে— এমন প্রত্যাশা ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের।
নথিপত্র বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, নজিরবিহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে লুটপাটে বিপর্যস্ত পঁাচটি ব্যাংক একীভূতের মাধ্যমে শুরু সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। আগের পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রথম ধাপে ব্যাংকটিকে স্থিতিশীল করা এবং এরপর ধীরে ধীরে পুনঃ মূলধনিকরণ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একীভূত পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকিং সিস্টেমের কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার (সিবিএস) ইন্টিগ্রেশন বড় চ্যালেঞ্জ। দ্রুততম সময়ে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি-সংক্রান্ত কাজ সম্পন্ন করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগ দায়িত্ব পালন করছে। এক্সিম ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় করা হতে পারে। আর ইউনিয়ন ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় হচ্ছে গুলশান শাখা। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। যার মধ্যে সরকার দিচ্ছে ২০ হাজার কোটি এবং আমানতকারীদের শেয়ার থেকে অবশিষ্ট ১৫ হাজার কোটি টাকা মিলবে। অনুমোদিত মূলধন রাখা হয়েছে ৪০ হাজার কোটি।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, একীভূত হওয়া শবিয়াহ্ভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংকের (ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক) সম্মিলিত হিসাবে ৭৫ লাখ গ্রাহকের আমানতের পরিমাণ ১ লাখ ৫২ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকা। তার মধ্যে ব্যক্তিগত সঞ্চয়কারীদের আমান ৪৬ হাজার কোটি। বাকি ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবে জমা ছিল। ব্যাংকের ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯৫ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা। পাঁচ ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি বা ৭৭ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরীর অভিমত— সবার আগে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের দিকে নজর দিতে হবে। তাদের আতঙ্ক না কাটলে নতুন ব্যাংককে সফল করা কঠিন হবে। এরই মধ্যে ইসালামী ব্যাংকে সমস্যা দেখা দিয়েছে, তাতে এই পাঁচ ব্যাংকের প্রভাব রয়েছে। সামনে ব্যাংকের ওপর আস্থা আরও কমার শঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া বিদেশে এলসি বকেয়া হলে সুনাম নষ্ট হবে। তখন আমদানি করতে অনেকে গ্যারান্টি দিতে চাইবে না। আবার করলেও অতিরিক্ত চার্জ দিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর গত ৪ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেছেন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। আর গত ৭ ডিসেম্বর একীভূত হওয়া পাঁচ সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের গ্রাহকদের ২ লাখ টকা পর্যন্ত আমানত ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। মূলত আমানত সুরক্ষা তহবিল থেকে গত ৩১ মে পর্যন্ত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অধীন পাঁচটি ব্যাংকের মাত্র ৯ লাখ ১৮ হাজার গ্রাহককে মোট ৪ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। আর তিন মাস অন্তর টাকা ফেরত শুধু ঘোষণায় আটকা রয়েছে। এ ছাড়া যাদের জমা টাকার ওপর ৪ শতাংশ মুনাফা বা সুদ দেওয়ার কথা তা হিসাবে রয়েছে, তোলার সুযোগ নেই আমানতকারীদের।
শেয়ার বাজারের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকের পাবলিক শেয়ার ৬৫, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ৩১, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ১৮, এক্সিম ব্যাংকের ২৯ ও ইউনয়িন ব্যাংকের ১৮ শতাংশ। তবে সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন— পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারের দাম ১০ টাকা ফেস ভ্যালুর বিপরীতে ৫ টাকার নিচে নেমেছে।






