রংপুর বিভাগ
কবে ভাঙবে স্বাস্থ্য কর্তাদের ঘুম
- ৬-১০ বছর ধরে অনুপস্থিত ২০ ডাক্তার
- রোগী দেখছেন নিজ হাসপাতালে
- নেওয়া হয়নি কার্যকর কোনো ব্যবস্থা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রংপুর বিভাগের সরকারি হাসপাতালগুলোয় অন্তত ২০ জন চিকিৎসক বছরের পর বছর ধরে বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। কেউ বিদেশে বসবাস করছেন, কেউবা বেসরকারি হাসপাতালে রোগী দেখছেন। সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী দুই মাসের বেশি অনুমোদনহীন অনুপস্থিতির কারণে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে বিভাগের ওইসব চিকিৎসকের কর্মস্থলে অনুপস্থিতি অনেক ক্ষেত্রে ৬ থেকে ১০ বছর পার হলেও নেওয়া হয়নি কার্যকর কোনো ব্যবস্থা। ফলে পদগুলো কার্যত আটকে থাকায় এসব পদে নতুন চিকিৎসকও নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না। এতে চিকিৎসক সংকট বাড়ছে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ৪২টি। সেখানে কাগজে-কলমে কর্মরত ১৯ জন চিকিৎসক। তবে নিয়মিত সেবা দিচ্ছেন ১৪ জন। মেডিকেল অফিসার ডা. শাহেদুর রহমান ২০১৯ সালের ১৩ জানুয়ারি, ডা. আব্দুল কাদের তালুকদার একই বছরের ৫ মার্চ এবং ডা. আবু সাদাত মো. সায়েদ শরীফ ওই বছরের ২৬ এপ্রিল থেকে বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা লুৎফুল কবীরের ভাষ্য, ‘বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানানো হয়েছে। তাদের কোনো খোঁজখবর পাওয়া যায়নি।’ তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা ডা. আব্দুল কাদের তালুকদার বর্তমানে রংপুর নগরীর ধাপ এলাকায় তার মালিকানাধীন তালুকদার হাসপাতালে নিয়মিত রোগী দেখছেন। ডা. আব্দুল কাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেন, ‘আমাকে দূরে বদলি করা হয়েছিল, দেওয়া হয়নি পদোন্নতি। এজন্য আর সেখানে যাইনি।’
ডা. শাহেদুর রহমানের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেননি বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পঞ্চগড় জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়। আরেক চিকিৎসক আবু সাদাত মো. সায়েদ শরীফ পাভেল প্রায় ছয় বছর আগে সপরিবারে কানাডায় চলে গেছেন বলে জানিয়েছেন তার স্বজনরা। শুধু পঞ্চগড়ই নয়, একই রকম চিত্র রংপুর বিভাগের অন্য জেলাগুলোয়ও। দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক অনন্যা রায় প্রায় ১০ বছর ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত। তিনি বর্তমানে পরিবারসহ জাপানে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক আ ন ম কায়সার আনামও ছয় বছর ধরে কর্মস্থলে নেই। তার চাচা কামাল তৌফিকুল ইসলাম বললেন, ‘করোনার পর তিনি লন্ডনে গেছেন। আমাদের জানা মতে, চাকরিস্থলে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে বিদেশে গেছেন তিনি।’
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. আসাদুজ্জামান আসাদ প্রায় এক বছর ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে ঢাকার সিকেডি ইউরোলজি হাসপাতালে কর্মরত আছেন। তার স্বীকারোক্তি, ‘পারিবারিক কারণে ঢাকায় আছি, প্রয়োজন হলে চাকরি ছেড়ে দেব।’
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত আছেন আরও অন্তত ১০ চিকিৎসক। সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন রংপুর মহানগরের সভাপতি অ্যাডভোকেট জোবায়দুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করেন, ‘তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে ফৌজদারি ব্যবস্থাও নেওয়া উচিত।’
রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. ওয়াজেদ আলী নিশ্চিত করেন, বিভাগে অন্তত ২০ চিকিৎসক দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত। তাদের কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে জানানো হয়েছে। পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের।
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ডা. জাহিদ রায়হানের ভাষ্য, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




