ফাটল ধরা ছাদের নিচেই চলছে চিকিৎসাসেবা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পুরনো ভবন এখন ঝুঁকিপূর্ণ। ভবনের বিভিন্ন স্থানে ছাদে দেখা দিয়েছে বড় বড় ফাটল। নিয়মিত খসে পড়ছে পলেস্তারা ও ইটের সুরকি। এতে চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী, রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক। দ্রুত ভবনটি সংস্কার বা নতুন ভবন নির্মাণ না হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র বলছে, ১৯৭২ সালে ৩১ শয্যার হাসপাতাল হিসেবে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনতলা নতুন ভবন নির্মাণ করে হাসপাতালটি ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। তবে কাগজে-কলমে ৫০ শয্যা হলেও এখনো ৩১ শয্যার জনবল দিয়েই পরিচালিত হচ্ছে হাসপাতালটি।
ভেদরগঞ্জ ও সখিপুর থানা নিয়ে গঠিত এ উপজেলায় প্রায় ৩ লাখ ৩ হাজার ৫৩৫ মানুষের বসবাস। প্রতিদিন গড়ে ৮০০ থেকে ৯০০ রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে হাসপাতালে আসেন। কিন্তু জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটে ব্যাহত হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা।
হাসপাতালে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ৪৫টি। কর্মরত আছেন মাত্র ২৩ জন। কর্মকর্তা-কর্মচারীর ১৭৩টি পদের বিপরীতে রয়েছে ১১৩ জন। রয়েছে নার্স সংকট। নেই অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে সিজারিয়ান অপারেশন। চালক না থাকায় বন্ধ রয়েছে অ্যাম্বুলেন্স সেবাও। এ ছাড়া হাসপাতালে নেই এক্স-রে মেশিনসহ প্রয়োজনীয় অনেক চিকিৎসা সরঞ্জাম।
আজ রবিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রতিদিনের মতো শত শত রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে হাসপাতালে এসেছেন। শয্যা সংকটের কারণে অনেক রোগীকে মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। পুরনো ভবনের প্রথম ও দ্বিতীয় তলার বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ফাটল দেখা গেছে। অনেক জায়গায় পলেস্তারা ও ইটের সুরকি খসে পড়ছে। রোগী ও স্বজনরা ঝুঁকিপূর্ণ স্থান এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছেন। তবে প্রয়োজনের তাগিদে সেই স্থান ব্যবহার করছেন অনেকেই।
গত ২২ জুলাই দুপুরে হাসপাতালের পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয়ের ছাদের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে। এ সময় কর্তব্যরত এক নার্স অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান। এ ছাড়া জরুরি বিভাগ, চিকিৎসকদের বিশ্রামাগার এবং বিভিন্ন ওয়ার্ডের ছাদেও ফাটল দেখা দিয়েছে। এতে আতঙ্ক আরও বেড়েছে।
সখিপুর ইউনিয়নের বেপারীকান্দি গ্রামের পারুল বেগম। পাঁচ বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে চার দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তিনি বললেন, ‘মেয়ের ওষুধ আনতে দ্বিতীয় তলা থেকে নিচে নামার সময় বারবার ছাদের দিকে তাকাতে হয়। ফাটল ধরা জায়গা দিয়ে যেতে ভয় লাগে। মাঝেমধ্যে সিমেন্ট ও সুরকির বড় অংশ খসে পড়ে। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে যদি নিরাপত্তাহীনতায় থাকতে হয়, তাহলে তা খুবই উদ্বেগের।’
রামভদ্রপুর ইউনিয়নের ভাটিতা গ্রামের শিপন মিয়া জানালেন, মানুষ হাসপাতালে আসে সুস্থ হওয়ার জন্য। কিন্তু এখানে এসে ছাদ ভেঙে পড়ার আতঙ্কে থাকতে হয়। ভবনটি দ্রুত সংস্কার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতিও নিশ্চিত করতে হবে।
রোগীর স্বজন আশরাফুল হক সজিব মাঝি বললেন, ‘চিকিৎসকের কক্ষের সামনে অপেক্ষা করার সময়ও আতঙ্কে থাকতে হয়েছে। কখন ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে সেই ভয় কাজ করে। এ অঞ্চলের মানুষের নিরাপদ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ প্রয়োজন।’
হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. জহিরুল ইসলাম বললেন, ‘প্রথম ও দ্বিতীয় তলার বিভিন্ন স্থানে ছাদে ফাটল দেখা দিয়েছে। নিয়মিত পলেস্তারা, ইটের সুরকি ও সিমেন্ট খসে পড়ছে। রোগীদের সতর্ক করতে আনসার সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসাসেবা চললেও ভবনের ঝুঁকি চিকিৎসক ও রোগী—উভয়ের জন্য উদ্বেগের।’
ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবু নাঈম মো. ইফতেখারুল ইসলাম বললেন, ‘ভবন থেকে পলেস্তারা খসে পড়ার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি হাসপাতালটি জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটেও ভুগছে। নার্স ও অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে সিজারিয়ান অপারেশন বন্ধ রয়েছে। চালক না থাকায় অ্যাম্বুলেন্স সেবাও চালু রাখা যাচ্ছে না। সীমিত জনবল নিয়েই সর্বোচ্চ চেষ্টা করে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।’






