যার কেউ নেই, তার আছেন ‘লাইলী বু’

লাইলী বেগম
বগুড়ার সোনাতলা উপজেলার পূর্বাঞ্চলের গ্রামগুলোতে ‘লাইলী বু’ একটি পরিচিত নাম। বাড়িতে কেউ অসুস্থ, দেখাশোনার কেউ নেই, খবর পেলেই ছুটে যান তিনি। প্রয়োজন হলে রোগীর সঙ্গে শহরের হাসপাতালেও থাকেন। এভাবেই প্রায় ৫৫ বছর ধরে বিনা পারিশ্রমিকে অসুস্থ মানুষের সেবা করে আসছেন উপজেলার মধুপুর ইউনিয়নের ফুলবাড়িয়া গ্রামের ৭০ বছর বয়সী লাইলী বেগম।
সোনাতলা উপজেলার বাঙালি নদী পেরিয়ে ফুলবাড়িয়া গ্রামে লাইলী বেগমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, কিছুক্ষণ আগেই বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে এক রোগীর সেবা করে ফিরেছেন তিনি। বাইরে তখন টিপটিপ বৃষ্টি। ক্লান্ত শরীর নিয়েও বারান্দায় বসে নিজের দীর্ঘ মানবসেবার গল্প শোনান লাইলী বেগম।
১৯৭০ সালে অল্প বয়সে একই গ্রামের সোলাইমান প্রামাণিকের সঙ্গে বিয়ে হয় লাইলীর। সন্তানসম্ভবা অবস্থায় স্বামীর মৃত্যু হয়। এরপর ছেলেসন্তানের জন্ম দেন। তারপর ছেলে শাহজাহান প্রামাণিককে নিয়ে শুরু হয় তার সংগ্রামের জীবন। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া লাইলী তখন স্বামীর ভিটা আঁকড়ে পড়ে থাকেন। তাদের গ্রামটি বন্যাপ্রবণ হওয়ায় প্রতিবছর তিন থেকে চার মাস পানিতে ডুবে থাকত। ফসলহানির পাশাপাশি কাজের সুযোগও ছিল কম।
এই পরিস্থিতিতে বাড়ির আশপাশের অসুস্থ মানুষের সেবায় এগিয়ে আসেন লাইলী। গ্রামের এমন কেউ অসুস্থ হলে, যার দেখাশোনার কেউ নেই, খবর পেলেই ছুটে যেতেন তিনি। নিজের বাবা-মা, ভাই-বোনের মতো করে রোগীর সেবা করতেন। কখনো দুই-তিন দিন, আবার কখনো সাত-আট দিনও সন্তানকে মায়ের কাছে রেখে রোগীর পাশে থাকতে হয়েছে তাকে।
এভাবেই ধীরে ধীরে এলাকায় তার পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত হয়, ‘যার কেউ নেই, তার আছে লাইলী বু।’
একসময় স্থানীয় ধাইদের সহযোগিতার জন্যও তার ডাক পড়তে থাকে। পরে নিজেই ধাইয়ের কাজ শিখে নেন। রোগীর সেবার পাশাপাশি শুরু করেন প্রসূতি মায়েদের প্রসবে সহযোগিতা করা। কোনো জটিলতা দেখা দিলে অসুস্থ ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে সোনাতলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ছুটে যেতেন তিনি। এ কারণে হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছেও পরিচিত হয়ে ওঠেন লাইলী বেগম। পরে পরিবার পরিকল্পনা অফিসের মাধ্যমে ধাইয়ের কাজের প্রশিক্ষণও নেন তিনি। এ পর্যন্ত প্রায় ৩০০ প্রসূতি মায়ের প্রসবে ধাইয়ের কাজ করেছেন বলে জানান তিনি।
মধুপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য তাহেরুল ইসলাম বললেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি লাইলী বেগমকে মানুষের সেবা করতে দেখে আসছেন। অসুস্থ মানুষের জন্য তিনি নিবেদিতপ্রাণ। বিনা পারিশ্রমিকে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এমন মানুষ সমাজে খুবই কম।
মধুপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল আলিম বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে লাইলী বেগম নিজ উদ্যোগে মানুষের সেবা করে আসছেন। তিনি সাধারণত কোনো পারিশ্রমিক নেন না। কেউ কেউ নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সামান্য আর্থিক সহযোগিতা করেন।
সোনাতলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শারমিন কবিরাজ বলেছেন, তিনি বিভিন্ন সময় লাইলী বেগমকে রোগীদের সঙ্গে হাসপাতালে আসতে দেখেছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি অসুস্থ মানুষের সেবা করে আসছেন বলেও শুনেছেন।
সোনাতলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা স্বীকৃতি প্রামাণিক জানিয়েছেন, লাইলী বেগমের কথা তিনি শুনেছেন। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে তাকে বিধবা ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিয়মের মধ্যে তার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতার ব্যবস্থা করা হবে।
স্বামী হারানোর পর একমাত্র সন্তানকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রাম করছেন লাইলী বেগম। স্বামীর রেখে যাওয়া কিছু জমি বর্গা দিয়ে যে ফসল পান, তা দিয়ে সংসারের প্রয়োজন মেটে না। নিজের অভাব-অনটনের মধ্যেও অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে জীবনের ব্রত করে নিয়েছেন তিনি।
সোনাতলার গ্রামগুলোতে তাই লাইলী বেগম শুধু একজন সেবিকা নন, তিনি অনেক অসহায় মানুষের ভরসার নাম। দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে নীরবে মানুষের পাশে থেকে তিনি গড়ে তুলেছেন মানবসেবার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।




