প্রান্তিক প্রচেষ্টা
সাধের লাউয়ের বীজই বানাইল স্বাবলম্বী

তিস্তার চরাঞ্চলে গত কয়েক বছরে এমন শত শত কৃষকের জীবনে পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠেছে লাউয়ের বীজ। ছবি: আগামীর সময়
‘বাঁচি থাইকপার জন্যে দিন-রাইত খাটি। চরের জমিত কত কিছুই আবাদ করি, কিন্তুক কোনোটাতে পাই না ভালো দাম। ওঠে না খরচের টাকাই। তয় কদুর বিচিই হামাক পথের দিশা দেখাইচে বাহে...। অ্যালা হামরা দুইবেলা খ্যায়া থাইকপার পাই।’ রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার রমাকান্ত চরের কৃষক ফয়জার রহমান বলছিলেন কথাগুলো। তার গল্পটি এখন শুধু একজন কৃষকের ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, তিস্তার চরাঞ্চলে গত কয়েক বছরে এমন শত শত কৃষকের জীবনে পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠেছে লাউয়ের বীজ। যেখানে সবজি বিক্রি করে কৃষক প্রায়ই লোকসানের মুখে পড়েন, সেখানে বীজ উৎপাদন এখন তাদের জন্য তুলনামূলক লাভজনক একটি বিকল্প। কৃষকদের ভাষায়, লাউ নয়, আসল ফসল এখন তার বীজ।
তিস্তা নদী অববাহিকার মানুষ বছরের একটি বড় সময় কাটান অনিশ্চয়তায়। বর্ষায় নদীভাঙনে ঘরবাড়ি হারানোর ঝুঁকি আবার শুষ্ক মৌসুমে জেগে ওঠা চরে নতুন করে জীবন গড়ার সংগ্রাম— এ দুই বাস্তবতার মধ্যেই তাদের কৃষিনির্ভর জীবন।
শীতকাল জুড়ে চরাঞ্চলে আলু, ভুট্টা, গম, চীনাবাদাম, মিষ্টিকুমড়া, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচসহ আবাদ হয় বিভিন্ন ফসল। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শুধু তিস্তার চরাঞ্চলেই বছরে উৎপাদিত হয় প্রায় ৩০০ কোটি টাকার কৃষিপণ্য। তবে দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, সংরক্ষণের অভাব, বাজার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে অনেক সময় উৎপাদন খরচই তুলতে পারেন না কৃষক।
কৃষকের এই সাফল্যের শুরু প্রায় আট বছর আগে। ছালাপাক চরের বাসিন্দা আলাউদ্দিন স্থানীয় কৃষকদের লাউয়ের বীজ উৎপাদনে উৎসাহিত করেন এবং বাজারের সঙ্গে তাদের সংযোগ তৈরি করেন। প্রথম দিকে কৃষক কম ছিল, বীজের দামও তুলনামূলক কম ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে কৃষকের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে বীজের চাহিদাও। এখন তিনি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) একজন বীজ ডিলার। নিজেই কৃষকের কাছ থেকে প্রতি কেজি ৩০০ টাকা দরে বীজ কিনে নিচ্ছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি বীজ কোম্পানিও সরাসরি চরাঞ্চলে গিয়ে বীজ সংগ্রহ করছে।
আলাউদ্দিনের ভাষ্য, আগে যারা অভাব-অনটনে দিন কাটাতেন, এখন তাদের অনেকেই সচ্ছল। অন্তত ২০০ কৃষকের জীবনে এসেছে পরিবর্তন।
বাজারে বিক্রির জন্য যে কচি লাউ জনপ্রিয়, বীজ উৎপাদনের জন্য তার ঠিক উল্টো— সম্পূর্ণ পরিপক্ব লাউ প্রয়োজন। নভেম্বর-ডিসেম্বরে বীজ রোপণের পর কয়েক মাস ধরে গাছ বড় হয়। পরে লাউ পুরোপুরি পেকে গেলে তা সংগ্রহ করা হয়। এরপর লাউয়ের মাথা কেটে রেখে দেওয়া হয় কয়েক দিন। ভেতরের শাঁস পচে গেলে খোলস ভেঙে বের করা হয় বীজ। ধুয়ে পরিষ্কার করার পর কয়েক দিন রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ বা বিক্রি করা হয়।
গঙ্গাচড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুবেল হোসেন জানিয়েছেন, এ বছর উপজেলায় সবজির আবাদ হয়েছে প্রায় ৬০০ হেক্টর জমিতে। এর একটি বড় অংশে বীজ উৎপাদনের জন্য লাউ চাষ করেছেন কৃষক। কৃষি অফিস নিয়মিত মাঠপর্যায়ে পরামর্শ দিয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও হয়েছে ভালো।




