হবিগঞ্জ-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কে বদলে গেছে হাওরজীবনের গতি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কয়েক বছর আগেও সন্ধ্যা নামতেই যেসব মেঠোপথ সুনসান হয়ে যেত, ডাকাত-আতঙ্কে সন্ধ্যার পর জনশূন্য হয়ে পড়া সেই সড়কগুলোয় এখন রাতভর ছুটছে দূরপাল্লার যানবাহন। হাওরের বুক চিরে নির্মিত সড়ক ও সেতুর সংযোগে বদলে গেছে এলাকার চিত্র। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে প্রত্যন্ত গ্রামগুলোয় জীবনযাত্রায় এসেছে পরিবর্তন।
প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হবিগঞ্জ-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক ও কালনী নদীর ওপর সেতু নির্মাণের ফলে বদলে গেছে দুই জেলার হাওর এলাকা। লাখো মানুষ যুক্ত হয়েছেন সড়ক যোগাযোগের মূল স্রোতে।
সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলার মোট জনসংখ্যা ৫০ লাখের বেশি। কালনী ও কুশিয়ারা নদী দুই জেলার বিস্তীর্ণ ভাটি অঞ্চলকে বিভক্ত করেছে। যুগ যুগ ধরে বর্ষায় নৌকাই ছিল এসব এলাকার প্রধান বাহন। আর শুকনো মৌসুমে চলাচল করতে হতো হেঁটে। এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। রাতভর চলছে ভারী যানবাহন; একসময়ের নিস্তব্ধ হাওরের সড়কগুলো এখন ব্যস্ত মানুষের চলাচলে।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের মাধ্যমে হবিগঞ্জ অংশে ৫৫১ কোটি ৫১ লাখ ৩০ হাজার টাকা ব্যয়ে পাঁচটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। এর মধ্যে দুটি শেষ হয়েছে, আর তিনটি চলমান। চারটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান করছে এসব কাজ। প্রকল্পগুলোর আওতায় প্রায় ৫ কিলোমিটার নতুন সড়ক, চারটি আরসিসি গার্ডার সেতু, ১৭টি স্ল্যাব কালভার্ট, ১ হাজার ৮০০ মিটার আরসিসি ড্রেন, ৪ লাখ ৬২ হাজার ১০৫ বর্গমিটার সিসি ব্লক ও জিওটেক্সটাইল, ৮ হাজার ৫৫২ মিটার ব্রিক টো-ওয়াল, ১ হাজার ৮০০ মিটার আরসিসি টো-ওয়াল, একটি টোল প্লাজা, সাইন-সিগন্যাল, রোড মার্কিংসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। হবিগঞ্জের এসব কাজের বিস্তৃতি আজমিরীগঞ্জ থেকে সুনামগঞ্জের শাল্লা পর্যন্ত। এর পরের অংশে আরও প্রায় ৯০০ কোটি টাকা ব্যয়ে একই ধরনের কাজ চলছে শাল্লা থেকে দিরাই উপজেলা পর্যন্ত। এই অংশের কাজ করছে সুনামগঞ্জ সওজ।
হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ এবং সুনামগঞ্জের শাল্লা, জগন্নাথপুর ও দিরাই উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওর এবং শত শত গ্রামে একসময় কোনো পাকা সড়ক ছিল না। মেঠোপথ থাকলেও বিকেল গড়াতেই তা সুনসান হয়ে যেত। সন্ধ্যা নামলেই ডাকাতের আতঙ্কে বন্ধ হয়ে যেত চলাচল। অসুস্থ রোগীকে হবিগঞ্জ বা সুনামগঞ্জ জেলা সদরের হাসপাতালে নেওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। গরুর গাড়ি কিংবা শ্যালো ইঞ্জিনচালিত যানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাড়ি দিতে হতো পথ। অনেক রোগীর মৃত্যু হতো পথেই।
এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। মহাসড়ক তৈরি হওয়ায় এর সঙ্গে যুক্ত গ্রামীণ সড়কগুলোও পাকা করা হচ্ছে। সকালে ঢাকা বা সিলেটে উদ্দেশে রওনা দিয়ে কাজ শেষে আবার রাতেই বাড়ি ফিরছেন মানুষ। বিভিন্ন স্থানে সড়কের পাশে গড়ে উঠছে দোকানপাট ও বাজার। বদলে যাচ্ছে হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতি।
আজমিরীগঞ্জের হিলালপুর গ্রামের কৃষক ওয়ারিশ মিয়া বললেন, ‘আগে যে আত্মীয়-স্বজন কয়েক বছরেও একবার গ্রামে বেড়াতে আসতেন না, এখন তারা সপ্তাহে সপ্তাহে আসেন। একসময় এ অঞ্চলে বিয়ের সম্বন্ধও আসত না। এখন সড়ক যোগাযোগ উন্নত হওয়ায় ভালো এলাকায় আমাদের ছেলেমেয়েদের বিয়ে হচ্ছে। হাওরে উৎপাদিত ধানও সহজে বিক্রি করতে পারছি। দামও বেড়েছে।’
বেড়েছে জমির দাম: নির্মাণাধীন কালনী সেতু এলাকার আজমিরীগঞ্জের পিরিজপুর মৌজায় সড়ক যোগাযোগের প্রভাব পড়েছে জমির দামেও। মহাসড়ক নির্মাণে সওজ বিভাগ এ মৌজার ২১ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করেছে। অধিগ্রহণ করা জমির মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রতি বিঘা ১ লাখ ৬৬ হাজার টাকায়। তবে মহাসড়ক পুরোপুরি চালু হওয়ার আগেই বর্তমানে প্রতি বিঘা জমি বিক্রি হচ্ছে অন্তত ১৫ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে জমির দাম বেড়েছে প্রায় ১০ গুণ।
পিরিজপুর মৌজার হিলালপুর এলাকার হেলু মিয়া কয়েক বছর আগে তিন বিঘা জমি কিনেছিলেন ৭০ হাজার টাকায়। এখন ক্রেতারা তিন বিঘার জন্য ৪৫ লাখ টাকা পর্যন্ত দাম দিতে চান। তার আশা, সড়ক যোগাযোগ ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরো বাড়লে ভবিষ্যতে ওই জমি কোটি টাকায় বিক্রি করতে পারবেন। কেউ কেউ আবার কিছু জমি বিক্রি করে ব্যবসা শুরু করতে চাচ্ছেন।
হবিগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির হোসেন জানালেন, ২০১৯ সালে শুরু হওয়া আঞ্চলিক মহাসড়কের কাজ ২০২২ সালেই শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হাওরাঞ্চল হওয়ায় এবং চব্বিশের আন্দোলনে পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে কাজ বিলম্বিত হয়েছে। মহাসড়কের কিছু কাজ বাকি আছে। ২০২৭ সালের মধ্যেই নির্মাণকাজ শেষ হবে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতি ও যোগাযোগব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।





