ঢাকা-লক্ষ্মীপুর মহাসড়ক
ধুলায় দুর্ভোগ, বৃষ্টিতে খানাখন্দে জলাবদ্ধতা

ঢাকা-লক্ষ্মীপুর মহাসড়কের নোয়াখালীর চৌমুহনী থেকে লক্ষ্মীপুর বাস টার্মিনাল এলাকা পর্যন্ত ২৯ কিলোমিটার সড়ক চার লেনে উন্নীতের কাজ শুরু হয়েছে চলতি বছরের জানুয়ারিতে। ৫৬৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২৯ সালে। তবে নির্মাণকাজ শুরুর পর পুরোনো দুই লেনের সড়কটির বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত, বৃষ্টির পানি জমে জলাবদ্ধতা আর বৃষ্টি থামলে শুকনোর সময় চারদিকে ধু-ধু সাদা মেঘের ধুলায় ঢেকে যায়। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় থেকে শুরু করে পথচারী এবং ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের দূরপাল্লাগামী যাত্রী ও পরিবহন চালকরা।
এদিকে সম্প্রতি লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসনের মাসিক আইনশৃঙ্খলা সভায়ও নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুর মহাসড়কের বেহাল দশা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন পানিসম্পদ মন্ত্রী ও লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী।
এ সময় তিনি চলাচলে জনদুর্ভোগ কমানো ও দ্রুত সংস্কারের জন্য সংশ্লিষ্ট লক্ষ্মীপুর সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীকে নির্দেশ দেন। মন্ত্রীর এমন নির্দেশনার পরও কোনও ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ দেখা দিয়েছে স্থানীয়দের মাঝে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজ চলমান থাকায় সড়কের বিভিন্ন অংশে খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। বৃষ্টির সময় এসব গর্তে পানি জমে সড়কটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। আবার বৃষ্টি থামার পর সড়কে জমে থাকা ধুলা যানবাহন চলাচলের সময় বাতাসে উড়তে থাকে। নিয়মিত ও সঠিকভাবে পানি ছিটানো না হওয়ায় ধুলার মাত্রা আরও বেড়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, দূষণ রোধে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সমন্বয়হীতা রয়েছে। চার-লেন সড়কে খোঁড়াখুড়ি ও নির্মাণ কাজের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নীতিমালা থাকলেও সংশ্লিষ্ট সড়ক বিভাগ ও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানগুলো তা মানছে না। এতে ধুলার দূষণে রোগবালাই থেকে শুরু করে পোশাক-পরিচ্ছদ, আসবাবপত্র, বাসাবাড়ি, খাবার-দাবার সবকিছুতেই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন এ সড়কে চলাচলকারী ও দু’পাশের বাসিন্দারা।
সড়কের পথচারী ও বাসিন্দারা বলছেন, প্রতিদিন ধুলার মধ্যে চলাচল করতে হচ্ছে তাদের। এতে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি ও অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও শ্বাসকষ্টে ভুগা মানুষ বেশি সমস্যায় পড়ছেন বলে জানান তারা।
মোটরসাইকলে আরেহী মো. শিপন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষার চার লেন সড়ক নির্মাণ কাজ চলমান। কিন্তু নির্মাণাধীন সড়কের পাশের দুই লেন সড়কটিই এখন যাত্রী সাধারণের জন্য মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে। বড় বড় গর্ত আর ধুলো-বালিতে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, যত বার এ সড়কে চলাচল করবেন ততবারই গোসল করতে হবে।
জকসিন, মান্দারী, জেলা কারাগার সংলগ্ন এলাকা ও শহরের বাগবাড়ী এলাকার সড়কের পাশের কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, নির্মাণাধীন সড়কে কখনোই পানি পানি ছিটাতে দেখেননি তারা। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে খাবার-দাবার, মালামালসহ আসবাবপত্র ধুলবালিতে একাকার হয়ে নষ্ট হচ্ছে। এতে বেচাবিক্রিতে চরম ক্ষতির শিকার হচ্ছেন তারা। একই পরিস্থিতি মহাসড়কের দু’পাশের বাসাবাড়িগুলোতেও।
শুধু জনস্বাস্থ্য নয়, সড়কের বেহাল অবস্থার প্রভাব পড়েছে যান চলাচলেও। বড় বড় গর্তে পড়ে প্রায়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যানবাহনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ। কোথাও কোথাও যানবাহন বিকল হয়ে সড়কের ওপর পড়ে থাকছে। এতে যানজটের পাশাপাশি বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
শনিবার দুপুরে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার জকসিন সংলগ্ন একটি পেট্টল পাম্প এলাকায় হাইওয়ে সড়কে সার বাহী একটি পিকআপ ভ্যানের চাকার এক্সেল ভেঙে পড়ে থাকতে দেখা যায়।
রায়পুর কাজী ফারুকী স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীবাহী বাসচালক জানান, প্রতিদিন ৪৫ জন শিক্ষার্থী নিয়ে মহাসড়ক দিয়ে যাতায়াত করতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।ধুলাবালিতে শিক্ষার্থীদের স্কুলড্রেস খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আর গর্তে পড়ে নষ্ট হচ্ছে যন্ত্রাংশ। চার লেন কাজটি দীর্ঘমেয়াদী, কিন্তু পুরোন সড়কটি যাতায়াতের সুবিধার্থে সংস্কারের দাবি তার।
সড়ক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুর মহাসড়কের চৌমুহনী থেকে লক্ষ্মীপুর বাস টার্মিনাল পর্যন্ত ২৯ কিলোমিটার সড়ক দুই লেন থেকে চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্পটি পাঁচটি প্যাকেজে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। চার লেন সড়কের প্রস্থ হবে ২০ মিটার। এর মধ্যে লক্ষ্মীপুর অংশের প্রায় ১৮ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে দুটি প্যাকেজে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩২৯ কোটি টাকা। লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ বাজার থেকে মান্দারী বাজার এলাকা পর্যন্ত ৯ কিলোমিটার চার লেন নির্মাণ কাজ পায় রহমান ইঞ্জিনিয়ারিং কনেস্টাকশন অ্যান্ড বিল্ডাস এবং মান্দারী থেকে লক্ষ্মীপুর বাস টার্মিনাল এলাকা পর্যন্ত ৯ কিলোমিটার সড়কের কাজ পাস তাহের ব্রাদার্স নামে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান।
অন্যদিকে নোয়াখালী অংশের প্রায় ১১ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে তিনটি প্যাকেজে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২৪০ কোটি টাকা। দুটি প্যাকেজের কাজ পায় রিলায়েবল বিল্ডার্স নামে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। তবে জমি অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন জটিলতার কারণে একটি প্যাকেজের কাজ এখনো শুরু হয়নি।
যাত্রী ও যানবাহনের চালকদের অভিযোগ, সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে আগের তুলনায় যাতায়াতে সময় বেড়েছে। ধীরগতিতে যান চলাচল করায় অনেক রুটে ভাড়াও বেড়েছে। কোথাও কোথাও ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।
ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলাচলকারী দূরপাল্লার যাত্রী ও পরিবহন চালকরাও এই দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। গুরুত্বপূর্ণ এই আঞ্চলিক মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ও ছোট-বড় যানবাহন চলাচল করে।
স্থানীয়দের দাবি, চার লেন নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি পুরোনো সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো নিয়মিত মেরামত করতে হবে। একইসঙ্গে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং নির্মাণকাজের কারণে সৃষ্ট ধুলা নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত পানি ছিটাতে হবে।
লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. অরুপ পাল জানান, দূষিত বায়ু বা ধুলাবালি মানুষের নাক-মুখ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করলে শ্বাসকষ্ট, এজমা, হাঁপানি, জ্বর-সর্দি ও ফুসফুসে ইনফেকশনসহ জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারে। প্রতিদিনই এ ধরনের সমস্যা নিয়ে সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছেন ভুক্তভোগীরা। তাই ধুলাবালি যুক্তসড়কে যাতায়াতে বাধ্যতামূলকভাবে মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন এ কর্মকর্তা।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে নির্মাণাধীন সড়কে নিয়মিত পানি ছিটানো হচ্ছে বলে দাবি করেছেন লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ থেকে মান্দারি পর্যন্ত প্রায় ৯ কিলোমিটার চার লেন নির্মাণকাজে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রহমান ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড বিল্ডার্সের প্রকল্প ব্যবস্থাপক এমডি ইউছুফ।
তিনি জানান, দুটি পানির টাংবাহী গাড়ি নিয়ম করে সড়কে পানি ছিটানোর কাজ করছে। তবে পুরনো সড়ক মেরামতের কাজ ওয়ার্ক অর্ডারে ধরা নেই। তবুও যতটুকু সম্ভব চলাচলের সুবিধার্থে করা হচ্ছে। তবে সরাজমিনে কোথাও পুরো সড়কে পানি ছিটানোর কোনও টাংবাহী গাড়ি দেখা যায়নি।
অন্যদিকে সড়ক বিভাগ বলছে, নির্মাণকাজ চললেও যানবাহন চলাচলের উপযোগী সড়ক ব্যবস্থাপনা, ধুলা নিয়ন্ত্রণ ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের। বিষয়টি নিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামত ও জনদুর্ভোগ কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন নোয়াখালী উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আহসান উল্যা মজুমদার।
লক্ষ্মীপুর সড়ক ও জনপদ বিভাগের বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নজরুল ইসলাম বলেন, চার লেন নির্মাণ কাজ যেখানে প্রয়োজন সেখানে পানি ছিটাতে হয় কিন্তু অতিরিক্ত পানি ছিটালে নির্মাণ কাজে ক্ষতি হবে। তবে গর্তগুলো ঠিকাদারদের দিয়েই সংস্কারের কাজ করানো হচ্ছে। চারলেনের কাজ সম্পন্ন হলে যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিপণ্য বাজারজাত করণে ও শিক্ষা খানের উন্নয়নসহ লক্ষ্মীপুরের সকল ক্ষেত্রে উন্নয়ন ঘটবে বলে জানান এ কর্মকর্তা।








