আট লাখ টাকা হারিয়ে ফুটপাতে নতুন স্বপ্ন বুনছেন জাহাঙ্গীর-সাবিনা

ছবি: আগামীর সময়
ফুটপাতের ওপর ছোট্ট একটি কাপড়ের দোকান। সাজানো আছে মেয়েদের জামা, শিশুদের পোশাক আর পায়জামা। ক্রেতা এলে এগিয়ে যান মো. জাহাঙ্গীর। কখনো কাপড় দেখান, কখনো দাম বলেন। পাশে বসে বিক্রিতে সহযোগিতা করেন স্ত্রী মোসা. সাবিনা বেগম। আর দোকানের এক পাশে আপন মনে খেলছে তাদের ছোট্ট সন্তান সাহরিয়ার।
জিরো পয়েন্টের জলিল বিশ্বাস মার্কেটের গেটের সামনে এমনই এক ছোট্ট সংসার যেন ফুটপাতেই জায়গা করে নিয়েছে। প্রতিটি পোশাক বিক্রির সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের বেঁচে থাকার লড়াই। আছে একটু ভালো থাকার স্বপ্ন। সন্তানকে ঘিরে আছে সুন্দর ভবিষ্যতের প্রত্যাশা।
অথচ এই জায়গায় আসতে তাদের পেরোতে হয়েছে অনেক কঠিন পথ। একসময় ভালো চাকরির আশায় আট লাখ টাকা তুলে দিয়েছিলেন এক দালালের হাতে। ভেবেছিলেন, চাকরি হলে সংসারের অভাব ঘুচবে। স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে নিশ্চিন্তে কাটবে দিন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। চাকরিও মেলেনি। টাকাও ফেরত পাননি। টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যায় দালাল।
এক মুহূর্তে ভেঙে পড়ে জাহাঙ্গীরের সাজানো স্বপ্ন। হারানো টাকার শোক আর হতাশা তাকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে যে প্রায় দুই বছর নিজেকে গুটিয়ে রাখেন। পরে আবার ফিরে আসেন নিজ এলাকায়। নতুন করে বাঁচার তাগিদে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে চলে আসেন রাজশাহী শহরে।
শহরে এসে একটি ঘড়ির দোকানে কাজ নেন জাহাঙ্গীর। মাস শেষে বেতন পান আট হাজার টাকা। এই টাকায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে নগরীর বাসার রোড এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকেন। বাসাভাড়া, খাবার, সন্তানের প্রয়োজন- সবকিছু মেটাতে হিমশিম খেতে হয় তাকে। মাসের আয় ফুরিয়ে যায়। থেকে যায় প্রয়োজনের হিসাব।
স্বামীর এ টানাপড়েন কাছ থেকে দেখেছেন সাবিনা। দেখেছেন, সংসারের খরচ মেলাতে গিয়ে জাহাঙ্গীরের দুশ্চিন্তা। তার কষ্ট তাকে ভাবিয়েছে। একসময় সিদ্ধান্ত নেন, সংসারের দায়িত্ব শুধু স্বামীর কাঁধে রেখে বসে থাকবেন না। নিজেও কিছু করবেন।
শুরু করেন একটি কাপড়ের দোকানে কাজ। এর পাশাপাশি প্রতি শুক্রবার স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে বসেন ফুটপাতের এই দোকানে। দুপুর ৩টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে তাদের বেচাকেনা। মেয়েদের জামা বিক্রি করেন ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়। শিশুদের জামার দাম ২০০ টাকা। আছে কম দামের পায়জামাসহ নানা ধরনের পোশাক।
দোকানে ক্রেতা এলে দুজনই ব্যস্ত হয়ে পড়েন। একজন কাপড় দেখান, অন্যজন দাম বলেন। কখনো চলে দরদাম। বিক্রি হলে মুখে ফুটে ওঠে তৃপ্তির হাসি। খুব বেশি লাভ হয় না। তবু এই আয় তাদের কাছে অনেক মূল্যবান। কারণ, এর সঙ্গে মিশে আছে সংসারের স্বচ্ছলতার আশা।
জাহাঙ্গীরের কাছে স্ত্রীর এই সহযোগিতা শুধু বাড়তি আয়ের উৎস নয়। কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ানোর এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি বলেছেন, ‘আমার স্ত্রী আমাকে অনেক সহযোগিতা করে। আমি বিশ্বাস করি, সে একদিন ভালো কিছু করবে। আমিও তাকে সবসময় সহযোগিতা করার চেষ্টা করি। কাপড় কেনা থেকে শুরু করে ব্যবসার সব কাজেই তার পাশে থাকি।’
আট লাখ টাকা হারানোর পর জীবনে অনেক কঠিন সময় পার করেছেন জানিয়ে জাহাঙ্গীর বললেন, ‘পরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে রাজশাহী শহরে এসে নতুন করে শুরু করি। কিন্তু আট হাজার টাকা বেতনে সংসার চালানো খুব কঠিন। আমার কষ্ট বুঝতে পেরেই স্ত্রী নিজে কিছু করার চেষ্টা করছে। এখন আমরা দুজন মিলে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।’
স্বামীর কথা বলতে গিয়ে সাবিনার কণ্ঠেও মিশে থাকে মমতা। সংসারের অভাব তাকে ভাবায়। স্বামীর দুশ্চিন্তা তাকে কষ্ট দেয়। তাই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন তিনি।
সাবিনা বললেন, ‘আমার স্বামীর বেতন অনেক কম। এই টাকা দিয়ে সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হয়। আমি তাকে অনেক চিন্তা করতে দেখেছি। তিনি অনেক কষ্ট করেন। তাই ভাবলাম, আমিও কিছু একটা করি। একটি কাপড়ের দোকানে কাজ করি। পাশাপাশি প্রতি শুক্রবার স্বামীকে নিয়ে ফুটপাতে কাপড় বিক্রি করতে বসি। এতে সংসারে কিছুটা হলেও সহযোগিতা করতে পারছি।’
তার চাওয়া খুব বেশি নয়। স্বামীর কষ্ট কিছুটা কমুক। সংসারে স্বস্তি ফিরুক। সন্তানকে নিয়ে একটু ভালোভাবে বাঁচতে চান তারা। সাবিনার বিশ্বাস, দুজন মিলে চেষ্টা করলে একদিন নিশ্চয়ই ভালো কিছু করতে পারবেন।
জাহাঙ্গীরের জীবনে আট লাখ টাকা হারানোর ক্ষত এখনো রয়ে গেছে। সেই টাকা হয়তো আর ফিরে পাওয়া হবে না। কিন্তু থেমে থাকেনি জীবন। নতুন ঠিকানা, নতুন কাজ আর সীমিত সামর্থ্য নিয়েই আবার পথচলা শুরু করেছেন তিনি। এই পথচলায় সবচেয়ে বড় শক্তি স্ত্রী সাবিনা। যিনি স্বামীর দুশ্চিন্তাকে নিজের দায়িত্ব মনে করেছেন। সংসারের হাল ধরতে নেমেছেন নিজের মতো করে।
পাশেই খেলতে থাকা ছোট্ট সাহরিয়ার হয়তো এখনো বোঝে না, তার হাসিমুখ ধরে রাখতেই মা-বাবার এই নিরন্তর চেষ্টা। বোঝে না, ফুটপাতের প্রতিটি পোশাক বিক্রির সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
জাহাঙ্গীর-সাবিনার কাছে এই দোকান শুধু কয়েকটি কাপড় বিক্রির জায়গা নয়। এটি ঘুরে দাঁড়ানোর ঠিকানা। আট লাখ টাকা হারানোর পর নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস। তাদের স্বপ্ন হয়তো খুব বড় নয়। একটি ভালো সংসার, সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ আর অভাবের সঙ্গে প্রতিদিনের লড়াই থেকে একটু মুক্তি।
হয়তো একদিন ফুটপাতের এই ছোট্ট দোকানই বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের রূপ নেবে। হয়তো শুক্রবারের এই বেচাকেনা থেকেই শুরু হবে তাদের স্বচ্ছল জীবনের নতুন অধ্যায়। আপাতত তারা হাল ছাড়তে চান না। কারণ, আট লাখ টাকা হারিয়ে গেলেও একে অপরের প্রতি বিশ্বাস হারাননি জাহাঙ্গীর ও সাবিনা। আর সেই বিশ্বাসকে পুঁজি করেই ফুটপাতে প্রতিদিন একটু একটু করে নতুন স্বপ্ন বুনছেন তারা।




