চেয়ারম্যান থেকে বঙ্গভবন, মির্জা ফখরুলের যাত্রায় ঠাকুরগাঁওয়ে উচ্ছ্বাস

রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপি থেকে মির্জা ফখরুলের মনোনয়ন জমার খবরে ঠাকুরগাঁওয়ে মিষ্টি বিতরণ। ছবি: আগামীর সময়
হাতে হাতে মিষ্টির বাক্স। খাইয়ে দিচ্ছেন আশপাশের পরিচিতজনদের। ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি নেতাকর্মীদের আজ যেন উৎসবের দিন। উচ্ছ্বসিত সাধারণ মানুষও। মোড়ে মোড়ে চায়ের আড্ডায় একই আলোচনা- রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন এই জেলার সন্তান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
আজ বৃহস্পতিবার সকালে রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপি থেকে তার প্রার্থী হওয়ার খবর আসতেই বদলে যায় ঠাকুরগাঁওয়ের চিত্র। বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকরা বিভিন্ন জায়গায় নেমে যান মিষ্টি বিতরণে।
জেলার মানুষের কাছে এটি শুধু একজন রাজনীতিকের পদোন্নতি নয়, বরং নিজেদের মাটির একজন মানুষের রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে দেখার সম্ভাবনা।
নাট্যমঞ্চে অভিনয় দিয়ে যার কৈশোর-তারুণ্যের একটি অধ্যায়, সেই মানুষ পরবর্তী সময়ে দাঁড়িয়েছেন রাজনীতির সবচেয়ে বড় মঞ্চে। শিক্ষকতা করেছেন, পৌরসভার চেয়ারম্যান হয়েছেন, সংসদ সদস্য হয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। এরপর বিএনপির মুখপাত্র থেকে দলের মহাসচিব। দীর্ঘ এই পথচলার পর এবার তার সামনে বঙ্গভবনের দরজা।
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও সংসদ সদস্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা শেষে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নেন মির্জা ফখরুল। ঢাকা কলেজসহ কয়েকটি সরকারি কলেজে করেন অধ্যাপনা।
তবে রাজনীতির সঙ্গে তার সম্পর্ক আরও পুরনো। ছাত্রজীবনেই সক্রিয় হন এ পথে। পাশাপাশি নাট্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও ছিল তার অংশগ্রহণ। রাজপথের উত্তাপ আর নাট্যমঞ্চের আলো—দুই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে তার ব্যক্তিত্ব।
১৯৮৬ সালে শিক্ষকতা ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করেন মির্জা ফখরুল। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে স্থানীয় নেতৃত্বে শুরু হয় তার নতুন অধ্যায়। এরপর এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপিতে যোগ দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করতে থাকেন।
১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দল পরাজিত হলেও থেমে থাকেননি তিনি। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান ধারাবাহিকভাবে। ২০০১ সালের নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বিএনপি সরকারের আমলে কৃষি এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
২০০৮ সালের নির্বাচনে দলের পরাজয়েও রাজনীতিতে তার প্রভাব কমেনি। ২০০৯ সালে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হন। এরপর দলের অন্যতম প্রধান মুখপাত্র হিসেবে রাজপথ ও গণমাধ্যমে হয়ে ওঠেন পরিচিত মুখ। ২০১১ সালে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং পরে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পান।
দলের কঠিন সময় আন্দোলন-সংগ্রাম আর নানা রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন বিএনপির নেতৃত্বে ছিলেন মির্জা ফখরুল। দীর্ঘ পথচলার পর এবার দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির দলীয় প্রার্থী তিনি।
রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর বৃহস্পতিবার বিএনপি মহাসচিবের পদ থেকে পদত্যাগ করেন মির্জা ফখরুল। সরে দাঁড়ান মন্ত্রিত্ব থেকেও।
ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি ও মির্জা ফখরুলের ভাই মির্জা ফয়সল আমীন বললেন, ‘ঠাকুরগাঁও থেকেই মির্জা ফখরুলের রাজনীতির শুরু... দীর্ঘ ত্যাগ ও তিতিক্ষার পরে আজ তিনি তার প্রাপ্য সম্মান অর্জন করেছেন। তারেক রহমানসহ দলের স্থায়ী কমিটির সবার সিদ্ধান্তে তিনি রাষ্ট্রপতি পদের জন্য দলের মনোনয়ন পেয়েছেন। এজন্য আমরা অনেক আনন্দিত ও গর্বিত।’
স্থানীয় বাসিন্দা আনোয়ার বলেন, ‘আমাদের ঠাকুরগাঁওয়ের একজন মানুষ দেশের রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হয়েছেন। এটা আমাদের জন্য অনেক বড় আনন্দের খবর। আজ মিষ্টি বিতরণ করেছি, আনন্দ করেছি। তিনি নির্বাচিত হলে আমাদের গর্ব আরও বেড়ে যাবে।’
জাহিদ হাসান নামের আরেকজনের কথা, ‘তার রাজনীতির শুরু এই ঠাকুরগাঁওয়ে। এত বছর রাজনীতি করার পর আজ রাষ্ট্রপতি হওয়ার পথে এগিয়েছেন। এটা শুধু মির্জা ফখরুলের নয়, পুরো ঠাকুরগাঁওয়ের অর্জন।’
দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবেন, প্রত্যাশা ঠাকুরগাঁওবাসীর।










